আপনি জানেন কি? ‘সম্রাট পৃথ্বীরাজ’ বলিউড সিনেমাটিতে দেখানো হয় পৃথ্বীরাজ (অক্ষর কুমার) মোহাম্মদ ঘুরিকে হত্যা করছেন, অথচ সত্য হলো পৃথ্বীরাজ তার অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন!

বর্তমানে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীরা অত্যন্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন ইতিহাসে নিজেদেরকে জয়ী দেখানোর জন্য এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে পরাজিত দেখাতে। এজন্য তারা যেকোন প্রকার ইতিহাসকে বিকৃত করতেও পিছপা হচ্ছে না, তা যত বড় বিকৃতি ও মিথ্যার সাহায্য নিয়েই হোক না কেন।
সিনেমার পর্দা আর ইতিহাসের পাতার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত থাকতে পারে—তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ বর্তমান সময়ের বলিউডের বেশ কিছু পিরিয়ড-ড্রামা বা ঐতিহাসিক সিনেমা। আপনার ক্ষোভটি একেবারেই অমূলক নয়; সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক স্বার্থে কিংবা নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ তৈরির উদ্দেশ্যে ইতিহাসকে বিকৃত করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাস্তব ইতিহাস, মহাকাব্যের কল্পনা এবং সিনেমার বাণিজ্যিক বয়ানের মধ্য রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
ইতিহাস বনাম সিনেমা

সিনেমার রুপোলি পর্দা সবসময় সত্য কথা বলে না, বিশেষ করে যখন বিষয়টি হয় ইতিহাস। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বলিউডে ইতিহাসনির্ভর সিনেমার জোয়ার এসেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে প্রকৃত ইতিহাসকে একপাশে সরিয়ে রেখে একটি নির্দিষ্ট ‘পোলারাইজড’ বা ‘আমরা বনাম ওরা’ বয়ান তৈরি করা হচ্ছে। এর অন্যতম বড় উদাহরণ ২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সম্রাট পৃথ্বীরাজ’ সিনেমাটি, যেখানে ঐতিহাসিক সত্যের চেয়ে লোকগাথা ও বাণিজ্যিক সমীকরণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
১. প্রকৃত ইতিহাস কী বলে?
ইতিহাসের সমসাময়িক এবং নির্ভরযোগ্য পারসিয়ান ও রাজপুত উৎস (যেমন: তবকাত-ই-নাসিরী, তাজুল মাসির) পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১১৯১ সালের তরাইনের প্রথম যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ চৌহানের কাছে মোহাম্মদ ঘুরি পরাজিত ও আহত হয়ে ফিরে যান। কিন্তু ঠিক তার পরের বছর, অর্থাৎ ১১৯২ সালের তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে ঘুরি পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ফিরে আসেন এবং পৃথ্বীরাজ চৌহান চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন।
- পৃথ্বীরাজ চৌহানের মৃত্যু (১১৯২ খ্রিষ্টাব্দ): যুদ্ধে পরাজয়ের পর পৃথ্বীরাজকে বন্দী করা হয় এবং পরবর্তীতে করদ রাজ্য পরিচালনা বা বিদ্রোহের অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কোনো কোনো ঐতিহাসিক সূত্রে বলা হয় তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হন।
- মোহাম্মদ ঘুরির মৃত্যু (১২০৬ খ্রিষ্টাব্দ): পৃথ্বীরাজের মৃত্যুর পর মোহাম্মদ ঘুরি আরও ১৪ বছর জীবিত ছিলেন এবং ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাঁর শাসন ও অভিযান পরিচালনা করেন। ১২০৬ সালে সিন্ধু নদের তীরে দমিয়াক নামক স্থানে নামাজ পড়ার সময় খোখার উপজাতি অথবা ইসমাইলি ঘরানার এক আততায়ীর হামলায় তিনি নিহত হন।
ঐতিহাসিক সত্য এটাই যে, মোহাম্মদ ঘুরির মৃত্যুর সময় পৃথ্বীরাজ চৌহান জীবিতই ছিলেন না।
২. ‘সম্রাট পৃথ্বীরাজ’ বলিউড সিনেমাটি ইতিহাস নাকি কাল্পনিক কাব্য?
তাহলে সিনেমায় কেন দেখানো হলো যে পৃথ্বীরাজ ঘুরিকে হত্যা করছেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে কবি চাঁদ বরদাইয়ের লেখা ‘পৃথ্বীরাজ রাসো’ (Prithviraj Raso) নামক কাব্যে।
- মহাকাব্যের অতিরঞ্জন: ‘ can be considered as a historical fiction or epic poem, written long after the actual events.’ এটি কোনো ইতিহাসের সার্টিফাইড দলিল নয়। এই কাব্যে দাবি করা হয়, ঘুরি পৃথ্বীরাজকে অন্ধ করে দেওয়ার পর পৃথ্বীরাজ তাঁর ‘শব্দভেদী বাণ’ (শব্দ শুনে তীর ছোঁড়ার বিদ্যা) দিয়ে ঘুরিকে হত্যা করেন।
- সিনেমার উদ্দেশ্য: বলিউড পরিচালকেরা প্রকৃত ইতিহাসবিদদের মতবাদকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এই কাল্পনিক কাব্যিক গল্পটিকে বেছে নিয়েছেন। এর মূল কারণ, এতে বাণিজ্যিক নাটকীয়তা তৈরি করা সহজ এবং দর্শককে একধরণের কৃত্রিম জাতীয়তাবাদী আবেগে আপ্লুত করা যায়।
৩. বাণিজ্যিক ও হিন্দুত্ববাদী প্রেরণায় বলিউড সিনেমার মুসলিম বিদ্বেষী ‘মিথ্যা প্রোপাগান্ডা’ এবং তার প্রভাব
মধ্যযুগের যুদ্ধগুলো মূলত ছিল সাম্রাজ্য বিস্তার, ক্ষমতা এবং ভূখণ্ডের লড়াই। সেখানে হিন্দু রাজা যেমন মুসলিম সুলতানের সাথে যুদ্ধ করেছেন, তেমনি একজন হিন্দু রাজা অন্য হিন্দু রাজার বিরুদ্ধেও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছেন (যেমন পৃথ্বীরাজ চৌহানের সাথে কনৌজের রাজা জয়চন্দ্রের শত্রুতা)।
কিন্তু আধুনিক বাণিজ্যিক সিনেমাগুলো এই জটিল রাজনৈতিক সমীকরণকে সহজীকরণ করে ‘ভালো বনাম মন্দ’ কিংবা ‘ধর্মীয় যুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করে। এখানে প্রায়শই:
- মুসলিম চরিত্রগুলোকে অতিরিক্ত ক্রূর, অসভ্য এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন হিসেবে দেখানো হয়।
- ঐতিহাসিক খলনায়কদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন তারা বর্তমান যুগের কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করছে, যা সমাজে একধরণের ভুল বার্তা ও বিদ্বেষ ছড়ায়।
ইতিহাসের ভুল বা একপেশে উপস্থাপন কেবল বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি জনমানসে গভীর প্রভাব ফেলে। ইতিহাসকে যখন প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার বানানো হয়, তখন তা সমাজকে আরও বেশি বিভক্ত করে। তাই ৩ ঘণ্টার একটি বাণিজ্যিক সিনেমা দেখে ইতিহাস শেখার চেয়ে, প্রকৃত ঐতিহাসিক দলিল ও নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদদের বই পড়াটাই আসল সত্য জানার একমাত্র উপায়।
বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক ও আদর্শিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ইতিহাসকে নতুন করে লেখার বা একপেশেভাবে ব্যাখ্যা করার একটি স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার সমসাময়িক রাজনীতিতে নির্দিষ্ট জাতীয়তাবাদী ও হিন্দুত্ববাদী ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মধ্যযুগীয় ইতিহাসকে একধরণের সরলীকরণের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় অতীত রাজন্যবর্গের মধ্যকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বে ঘটা যুদ্ধগুলোকে একটি খাঁটি ধর্মীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়—যেখানে নিজেদের পক্ষকে সর্বদা পরম বীর ও বিজয়ী এবং মুসলিম শাসকদের চরম খলনায়ক বা পরাজিত হিসেবে দেখানোর একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রচেষ্টা থাকে।
এই ধরণের ইতিহাস পুনর্লিখন বা বিকৃতি কেবল পাঠ্যপুস্তক বা প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সিনেমা, নাটক এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মতো গণমাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের আবেগকে প্রভাবিত করার কাজে লাগানো হচ্ছে। তবে নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদদের মতে, মধ্যযুগের জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও ক্ষমতার লড়াইকে আধুনিক যুগের সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক চশমা দিয়ে বিচার করলে ইতিহাসের প্রকৃত সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতা দুই-ই হারিয়ে যায়।
