ইসলাম কি দত্তক নেয়াকে নিষিদ্ধ করে?

ইসলামে কি দত্তক নেওয়া হারাম? সহজ কথায় জেনে নিন আসল সত্য
আমাদের সমাজে একটি কথা খুব প্রচলিত আছে বা অনেকেই মনে করেন যে, ইসলাম ধর্মে বুঝি এতিম বা অসহায় শিশুকে দত্তক নেওয়া বা পালক সন্তান নেওয়া নিষিদ্ধ। বিশেষ করে যাদের নিজেদের সন্তান হয় না, তাদের মনে এই বিষয়টি নিয়ে অনেক কষ্ট এবং দ্বিধা কাজ করে। তারা হয়তো ভাবেন, “একটি অসহায় শিশুকে আশ্রয় দিতে চাই, কিন্তু ধর্ম কি আমাকে আটকাবে?”
আজকের এই লেখায় আমরা একদম খোলাসা করে এবং সহজ ভাষায় জানবো—আসলেই কি ইসলাম দত্তক নেওয়াকে নিষিদ্ধ করেছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো যৌক্তিক নিয়ম আছে?
আসল উত্তরটি কী?
এক কথায় উত্তর হলো— না, ইসলাম অসহায় শিশুকে লালন-পালন করতে নিষেধ করেনি। বরং ইসলাম এতিম ও নিরাশ্রয় শিশুদের দায়িত্ব নেওয়াকে অনেক বড় পুণ্যের কাজ বা সওয়াবের কাজ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
কিন্তু, এখানে একটি ‘কিন্তু’ আছে। আর সেটি হলো— পরিচয় গোপন করা।
ইসলাম যেটা নিষিদ্ধ করেছে তা হলো, শিশুটির আসল বাবার নাম মুছে ফেলে, যে তাকে লালন-পালন করছে তাকেই ‘জন্মদাতা পিতা’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া। অর্থাৎ, মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া।
সহজ করে বোঝার জন্য আমরা পুরো বিষয়টিকে দুই ভাগে ভাগ করতে পারি-
১. নিষিদ্ধ দত্তক (যেটা ইসলাম সমর্থন করে না)
ধরুন, কেউ একটি শিশুকে দত্তক নিলেন। এরপর শিশুটির জন্মনিবন্ধন, স্কুলের কাগজ বা সামাজিকভাবে তার আসল বাবার নাম মুছে ফেলে নিজের নাম বসিয়ে দিলেন। শিশুটি জানলোই না তার আসল বাবা-মা কে। সে পালক বাবাকেই নিজের জন্মদাতা বাবা মনে করে বড় হলো। ইসলামে এটি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কারণ, এটি সত্যকে গোপন করা এবং রক্তের সম্পর্ককে অস্বীকার করার শামিল।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে খুব সুন্দর একটি যুক্তি দিয়ে বিষয়টি বুঝিয়েছেন। সূরা আল আহযাবে আল্লাহ বলেন-
“আল্লাহ কোন মানুষের বুকের মধ্যে দুটি হৃদয় স্থাপন করেননি… এবং তোমাদের পোষ্যপুত্রদেরকে তোমাদের প্রকৃত পুত্র করেননি। এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র।”
এর মানে হলো, চাইলেই যেমন এক মানুষের দুইটা হার্ট বা হৃদয় হতে পারে না, তেমনি এক সন্তানের দুইজন জন্মদাতা বাবা হওয়াও প্রাকৃতিকভাবে অসম্ভব। আপনি মুখে বললেই কেউ আপনার ঔরসজাত সন্তান হয়ে যাবে না। সত্য সবসময় সত্যই থাকে।
২. বৈধ দত্তক বা লালন-পালন (যেটা ইসলামে খুবই প্রশংসনীয়)
দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হলো— আপনি একটি শিশুকে নিজের সন্তানের মতোই আদর-যত্ন দিয়ে বড় করবেন, তার পড়াশোনা, খাবার-দাবারের সব দায়িত্ব নেবেন। কিন্তু তাকে তার আসল বাবার পরিচয়ে বড় করবেন। তার কাগজপত্রে তার জন্মদাতা বাবার নামই থাকবে। যদি তার বাবার নাম জানা না থাকে, তবে তাকে ‘ধর্মীয় ভাই’ বা বন্ধু হিসেবে গণ্য করতে বলা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন-
“তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাক। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সঙ্গত।” (সূরা আল আহযাব: ৫)
অর্থাৎ, আপনি শিশুটির অভিভাবক (Guardian) হবেন, কিন্তু পিতা (Father) হিসেবে নিজের নাম লিখবেন না। এতে শিশুটি তার নিজের বংশপরিচয় জানলো, আর আপনিও মিথ্যার আশ্রয় নিলেন না। এটি ইসলামে সম্পূর্ণ বৈধ এবং অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
পিতৃপরিচয় ঠিক রাখা কেন জরুরি?
অনেকে ভাবতে পারেন, “নাম পাল্টালে এমন কী ক্ষতি?” ইসলাম বাস্তববাদী ধর্ম। এখানে আবেগের সাথে বাস্তবতার মিল রাখা হয়।
- সম্পদ ও উত্তরাধিকার: ইসলামে উত্তরাধিকারের কড়া নিয়ম আছে। যদি আপনি পালক সন্তানকে নিজের সন্তান পরিচয় দেন, তবে আপনার আসল ওয়ারিশরা তাদের হক থেকে বঞ্চিত হতে পারে, অথবা পালক সন্তান তার আসল বাবার সম্পত্তির হক থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
- বিয়ে-শাদীর নিয়ম (মাহরাম/গায়রে মাহরাম): এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুকে আপনি ছোট থেকে পাললেন, কিন্তু সে আপনার রক্তের সম্পর্কের কেউ নয়। সে যখন বড় হবে (প্রাপ্তবয়স্ক হবে), তখন আপনার পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে তার পর্দার বিধান বা মেলামেশার নিয়ম মানতে হবে। পালক বাবা বা মায়ের সাথে তার বিয়ে বৈধ (যদি রক্তের সম্পর্ক না থাকে), তাই তারা গায়রে মাহরাম। আপন ভাই-বোনের মতো তারা একে অপরের সামনে অবাধে চলাফেরা করতে পারবে না।
একটি বিশেষ ব্যতিক্রম (দুধ-মা বা মিল্ক ফস্টার)
পর্দার বা মেলামেশার এই সমস্যাটি সমাধানের একটি সুন্দর পথ ইসলামে আছে। যদি কোনো শিশুকে তার দুই বছর বয়সের মধ্যে কোনো নারী (যিনি তাকে দত্তক নিচ্ছেন) পাঁচবার বা তার বেশি বুকের দুধ পান করান, তবে সেই শিশুটি ওই নারীর ‘দুধ-সন্তান’ হয়ে যায়।
আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, যাদের দুধ তোমরা পান করেছ, তারা তোমাদের জন্য হারাম (অর্থাৎ তারা মায়ের মতো)। এর ফলে, ওই পালক মা এবং তার স্বামী-সন্তানদের সাথে শিশুটি আপন ভাই-বোনের মতোই দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারবে এবং পর্দা করার প্রয়োজন হবে না।
পশ্চিমা বিশ্ব বনাম ইসলামী পদ্ধতি
অনেকে পশ্চিমাদের ‘ফস্টার কেয়ার’ বা দত্তক পদ্ধতি দেখে মনে করেন ওটাই সেরা। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ আমরা দেখি না। অনেক সময় দেখা যায়, পরিচয় গোপন করে দত্তক নেওয়া শিশুদের ওপর মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন হয়। যুক্তরাজ্যের একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি বছর হাজার হাজার অভিযোগ আসে পালক পিতা-মাতার বিরুদ্ধে, যারা দত্তক নেওয়া শিশুদের ওপর নির্যাতন চালায়।
ইসলাম এই জায়গাতেই ভারসাম্য এনেছে। ইসলাম বলে, তুমি এতিমের দায়িত্ব নাও, তাকে ভালোবাসো, মানুষের মতো মানুষ করো—কিন্তু তার শেকড় বা আসল পরিচয় কেড়ো না। তাকে ধোঁকা দিও না।
শেষ কথা
যারা বলেন “ইসলামে দত্তক প্রথা নেই”—তারা আসলে ভুল বলেন বা না জেনে বলেন। ইসলামে এতিমের দায়িত্ব নেওয়া জান্নাতে যাওয়ার সহজ পথ। রাসুল (সা.) নিজে এতিমের দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন।
তাই আপনার যদি সামর্থ্য থাকে, তবে অবশ্যই কোনো অসহায় শিশুর দায়িত্ব নিন। তাকে বুকে জড়িয়ে বড় করুন। শুধু খেয়াল রাখবেন, তার আসল বাবার পরিচয় যেন হারিয়ে না যায়। আল্লাহ আমাদের মনের খবর রাখেন, তিনি আমাদের নিয়ত অনুযায়ী উত্তম প্রতিদান দেবেন।
আপনি কি এমন কোনো শিশুকে লালন-পালন করার কথা ভাবছেন বা কাউকে চেনেন যিনি এই দোলাচলে ভুগছেন? তাহলে এই লেখাটি তাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন অথবা ইসলামের সঠিক নিয়ম মেনে (শরীয়াহ সম্মত উপায়ে) কিভাবে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায় তা নিয়ে স্থানীয় কোনো আলেম বা মুফতির পরামর্শ নিতে পারেন।
তথ্যসূত্র: আল কুরআন- সূরা আহযাব ও সূরা নিসা; এবং তাফসীরে ইবনে কাসির।









