ইসলামে কি ছোঁয়াচে রোগকে অস্বীকার করা হয়েছে?

ইসলামে কি ছোঁয়াচে রোগকে (সংক্রমণ) অস্বীকার করা হয়েছে? সহজ কথায় এর আসল মানে কী? 🤔
আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা, কেমন আছেন সবাই? আশা করি আল্লাহর রহমতে ভালোই আছেন।
আজকে এমন একটা বিষয় নিয়ে কথা বলবো, যা নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক ভুল ধারণা আছে। অনেকেই মনে করেন, ইসলামে নাকি ছোঁয়াচে রোগ বা রোগ সংক্রমণকে পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু আসল ব্যাপারটা কী? আসুন, খুব সহজ ভাষায় আর সাধারণ মানুষের মতো করে বোঝার চেষ্টা করি।
১. একটা হাদীস আর একটা প্রশ্ন
আমরা একটা খুব পরিচিত হাদীস প্রায়ই শুনি-
রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “রোগ সংক্রমণ, কুলক্ষণ, পেঁচা এবং সফর মাস বলতে কিছু নাই।” (সহীহু বুখারী)
এই হাদীসটা দেখেই অনেকে চট করে বলে দেন, “দেখো, ইসলামে তো সংক্রমণকেই মানা হচ্ছে না!”
কিন্তু, একটু থামুন। মুহাদ্দিস বা যারা হাদীস নিয়ে গবেষণা করেন, তারা বলছেন— রাসূল (সাঃ) এখানে কোনো কিছুর অস্তিত্বকে অস্বীকার করেননি। বরং জাহেলী যুগের (ইসলামের আগের সময়) একটা ভ্রান্ত বিশ্বাসকে অস্বীকার করেছেন।
ব্যাপারটা কেমন?
আগের দিনের মানুষ মনে করতো-
- পেঁচার ডাক মানেই বিপদ আসবে (কুলক্ষণে মনে করতো)।
- সফর মাস এলেই খারাপ কিছু ঘটবে।
- আর রোগ-ব্যাধি নিজে নিজেই এক শরীর থেকে আরেক শরীরে চলে যায়। এখানে আল্লাহর কোনো হাত নেই।
ইসলাম ঠিক এই শেষ পয়েন্টটাকেই বাতিল করেছে। ইসলাম বলছে, রোগ-ব্যাধি আছে ঠিকই, কিন্তু সেটার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই যে সে নিজে নিজেই একজনকে ধরে ফেলবে। রোগ সংক্রমিত হয়, কিন্তু সেটা ঘটে আল্লাহর ইচ্ছায়, তাঁর হুকুম ছাড়া একটা পাতাও নড়ে না।
২. প্রথম উটটির গল্প
এই ব্যাপারটা একদম পরিষ্কার হয়ে যায় আরেকটা হাদীসে। একবার এক বেদুঈন (আরব গ্রামের লোক) এসে রাসূল (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন-
“ইয়া রসূলুল্লাহ! মরুভূমিতে সুস্থ-সবল উট থাকে। তাদের মধ্যে একটা খুজলী-পাঁচড়ায় (চুলকানি বা চর্মরোগ) আক্রান্ত উট আসলে তো সবগুলোকে ওই রোগে ধরিয়ে দেয়। এটা কেন হয়?”
এর জবাবে নবীজী (সাঃ) পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে প্রথম উটটিকে কে রোগাক্রান্ত করেছিলো?” (সহীহ মুসলিম)
এই সহজ প্রশ্নের মধ্যেই গভীর উত্তর লুকিয়ে আছে-
- প্রথম উটটাকে তো কেউ ছোঁয়ায়নি! তাকে অসুস্থ করেছেন আল্লাহ তাআলা।
- তেমনি, অন্যান্য সুস্থ উটগুলোকেও যে রোগ ধরলো, সেটাও প্রথম উটটার ‘নিজস্ব ক্ষমতা’ নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশেই সেটা ঘটেছে।
সারকথা: রোগ ছোঁয়াচে— এটা বাস্তব। কিন্তু ছোঁয়া লাগলেই হবে, এটা নিশ্চিত নয়। আল্লাহ চাইলে হবে, না চাইলে হবে না।
৩. তাহলে কি সতর্কতা নিতে হবে না?
ইসলাম যদি সত্যিই ছোঁয়াচে রোগকে অস্বীকার করত, তাহলে তো আর আমাদের সতর্ক হওয়ার দরকার ছিল না। কিন্তু ইসলাম তো আমাদের বাঁচতে শিখিয়েছে!
দেখুন, ছোঁয়াচে রোগ আছে, তাই রাসূল (সাঃ) আমাদের সতর্ক থাকারও নির্দেশ দিয়েছেন-
- ১ম সতর্কবাণী: রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “অসুস্থ উটগুলোর মালিক তার উটগুলোকে সুস্থ পশুর দলে পাঠিয়ে দেবে না।” (সহীহ মুসলিম) — কেন পাঠাবে না? কারণ রোগ ছড়াতে পারে!
- ২য় সতর্কবাণী: তিনি আরও বলেছেন, “সিংহের আক্রমণ থেকে যেভাবে পলায়ন কর কুষ্ঠরোগী থেকেও সেভাবে পলায়ন করো।” (সহীহ আল বুখারী) — কুষ্ঠরোগ তখন খুব ছোঁয়াচে এবং মারাত্মক মনে করা হতো। এখানে আমাদের শারীরিক সতর্কতা নিতে বলা হচ্ছে।
আমরা যেমন আগুন দেখলে সতর্ক হই, বিষ দেখলে খাই না, তেমনি রোগাক্রান্ত মানুষ দেখলে বা রোগের সময় সতর্কতা অবলম্বন করা ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো ভুল নয়, বরং এটা একটা বাস্তব কারণ (সাবধানতা) গ্রহণ করা।
৪. তাহলে কুষ্ঠ রোগীর সাথে কেন খেলেন?
তবে এর উল্টো দিকও আছে। একবার নবী (সাঃ) একজন কুষ্ঠরোগীর সাথে বসে খাবার খেলেন এবং বললেন-
“আল্লাহর উপর আস্থা রেখে আল্লাহর নামে খাওয়া শুরু করো।” (তিরমিযী)
এর মানে কী? এর মানে হলো, তিনি দেখাতে চাইলেন— আমি সতর্কতা নিলাম না, তাও যদি আল্লাহ না চান, তবে আমার রোগ হবে না!
আসল শিক্ষাটা হলো–
- সতর্কতা নেওয়া: রোগের কারণ থেকে দূরে থাকতে হবে। (যেমন: অসুস্থ উটকে সুস্থ উটের কাছে না পাঠানো)।
- বিশ্বাস রাখা: কিন্তু যদি ভুলবশত বা অন্য কোনো কারণে কাছাকাছি যেতেই হয়, তখন দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে, রোগ ছোঁয়া লাগলেই নিজে নিজে হয়ে যায় না। আল্লাহর হুকুম হলেই কেবল হবে।
৫. শেষ কথা
তাহলে পুরো আলোচনাটার একদম সহজ সারাংশ হলো-
- সংক্রামক ব্যাধি আছে: এটা একটা বাস্তব কারণ (Cause)।
- সংক্রমণ হয়: কিন্তু সেটা রোগের নিজস্ব ক্ষমতা নয়।
- ঈমান বা বিশ্বাস: রোগ সংক্রমণ ঘটে আল্লাহর ইচ্ছায়, তাঁর হুকুম বা তাকদীর ছাড়া নয়।
কেউ যদি মনে করে রোগটা নিজে নিজেই জোর করে ঢুকে যায়, তবে সেটা জাহেলী যুগের ভ্রান্ত বিশ্বাস। আর কেউ যদি বলে, ‘রোগই নেই, তাই সতর্কতা নেব না’, তবে সেটাও হাদীস এবং বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হলো।
আমরা মুসলমানরা বিশ্বাস করি: সতর্কতা নেব, কিন্তু ভরসা রাখব শুধু আল্লাহর উপর। তিনিই রক্ষাকারী।
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল (দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার)
পরিবেশনায়: আপনার প্রিয় ব্লগিং বন্ধু ইনফরমেশন বাংলা (informationbangla.com)









