ই-পাসপোর্ট আবেদন বাতিল করার নিয়ম

ই-পাসপোর্ট আবেদন করার পর অনেকেই বিভিন্ন কারণে তা বাতিল বা ডিলিট করতে চান। তথ্যে ভুল, পরিকল্পনার পরিবর্তন, বা অন্য কোনো কারণে আবেদন বাতিলের প্রয়োজন হতে পারে। এই ব্লগ পোস্টে ই-পাসপোর্ট আবেদন বাতিল করার সঠিক নিয়ম, প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, এবং এর সুবিধা ও অসুবিধাগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
(১) কেন পাসপোর্ট আবেদন বাতিল করতে হয়?
ই-পাসপোর্ট আবেদন বাতিল করার পিছনে প্রধানত দুটি কারণ থাকে। প্রথমত, আবেদন ফর্মে ভুল তথ্য প্রদান করা হলে তা সংশোধন বা বাতিলের প্রয়োজন হয়। দ্বিতীয়ত, কেউ যদি পাসপোর্ট করার পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন বা পাসপোর্টের প্রয়োজন না থাকে, তাহলে আবেদনটি বাতিল করতে চান।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যদি কোনো আবেদন বাতিল না করা হয়, তাহলে একই জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্ম নিবন্ধন সনদ (BRC) ব্যবহার করে দ্বিতীয়বার নতুন আবেদন করা যায় না। তাই, ভুল সংশোধন বা পরিকল্পনা পরিবর্তনের জন্য আবেদন বাতিল করা অত্যন্ত জরুরি।
(২) পাসপোর্ট আবেদন বাতিল করার প্রক্রিয়া
ই-পাসপোর্ট আবেদন বাতিল করার প্রক্রিয়া আবেদনের অবস্থার উপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। নিচে দুটি প্রধান পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো-
ক) ছোটখাটো ভুল হলে সংশোধন
যদি আবেদনে ছোটখাটো ভুল থাকে, যেমন নামের বানানে সামান্য ভুল বা অন্য কোনো তথ্যে ত্রুটি, তাহলে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে সংশোধনের জন্য আবেদন করা যায়। এই ক্ষেত্রে পুরো আবেদন বাতিল করার প্রয়োজন হয় না। আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী উপ-পরিচালক (Assistant Director) এর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে ভুল সংশোধন করা সম্ভব।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
- অনলাইন আবেদনের সারাংশ (Application Summary) এর প্রিন্ট কপি।
- জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন সনদের মূল ও ফটোকপি।
- ভুল তথ্য সংশোধনের জন্য প্রমাণপত্র (যেমন, শিক্ষাগত সনদ বা অন্যান্য ডকুমেন্ট)।
- সংশোধনের জন্য একটি হাতে লেখা দরখাস্ত, যাতে ভুল তথ্য ও সঠিক তথ্য উল্লেখ থাকবে।
প্রক্রিয়া:
- আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে সহকারী উপ-পরিচালকের কাছে দরখাস্ত জমা দিন।
- কর্মকর্তা আপনার তথ্য যাচাই করে ভুল সংশোধন করবেন এবং প্রয়োজনে ডেলিভারি স্লিপ প্রদান করবেন।
- সংশোধনের পর পাসপোর্ট প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যাবে।
খ) বড় ভুল বা সম্পূর্ণ বাতিলের প্রয়োজন হলে
যদি আবেদনে বড় ধরনের ভুল থাকে (যেমন, ভুল জন্ম তারিখ, ভুল ঠিকানা, বা ভুল মোবাইল নম্বর) অথবা আবেদনকারী পাসপোর্ট করতে আর আগ্রহী না হন, তাহলে পুরো আবেদন বাতিল করতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি দুইভাবে সম্পন্ন করা যায়:
i) ম্যানুয়ালি পাসপোর্ট অফিসে আবেদন
যদি আবেদনটি ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়ে থাকে এবং স্ট্যাটাস “Incomplete” বা “Draft” না হয়, তাহলে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে ম্যানুয়ালি আবেদন বাতিল করতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি নিচে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হলো:
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
- একটি হাতে লেখা দরখাস্ত, যাতে নিম্নলিখিত তথ্য উল্লেখ থাকবে-
- আবেদনকারীর নাম, পিতা-মাতার নাম, এবং জন্ম তারিখ।
- অনলাইন আবেদনের আইডি নম্বর (OID)।
- আবেদন বাতিলের কারণ (যেমন, ভুল তথ্য বা পাসপোর্ট করার ইচ্ছা নেই)।
- অনলাইন আবেদনের সারাংশের প্রিন্ট কপি।
- জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন সনদের ফটোকপি।
- পাসপোর্ট ফি জমার রসিদ (যদি ফি জমা দেওয়া হয়ে থাকে)।
প্রক্রিয়া:
- আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে সহকারী উপ-পরিচালক বরাবর দরখাস্ত জমা দিন।
- দরখাস্তে স্পষ্টভাবে ভুল তথ্য বা বাতিলের কারণ উল্লেখ করুন।
- জমা দেওয়ার পর, সাধারণত ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে (কখনো ৭-১৪ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে) আবেদন বাতিল হয়ে যাবে।
- বাতিল হওয়ার পর আপনার ই-পাসপোর্ট অ্যাকাউন্টে লগইন করে “Delete” অপশন পাওয়া যাবে। এই অপশনে ক্লিক করে আবেদনটি সম্পূর্ণ ডিলিট করা যাবে।
- বাতিলের স্ট্যাটাস নিশ্চিত করতে www.epassport.gov.bd ওয়েবসাইটে “Check Status” অপশন ব্যবহার করুন।
II) অটোমেটিক ডিলিট অপশন
যদি আবেদনকারী পাসপোর্ট করার পরিকল্পনা বাতিল করেন এবং তৎক্ষণাৎ আবেদন ডিলিট করার প্রয়োজন না হয়, তাহলে ছয় মাস অপেক্ষা করলে আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে “Delete” অপশনের জন্য উপলব্ধ হয়ে যায়। এই ক্ষেত্রে পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না।
প্রক্রিয়া:
- ছয় মাস অপেক্ষা করুন, যতক্ষণ না আপনার অ্যাকাউন্টে “Delete” অপশন প্রদর্শিত হয়।
- www.epassport.gov.bd ওয়েবসাইটে লগইন করুন।
- আপনার আবেদনের স্ট্যাটাস চেক করুন এবং “Delete” অপশনে ক্লিক করে আবেদনটি ডিলিট করুন।
(৩) অনলাইনে পাসপোর্ট আবেদন বাতিল করার ধাপ
ই-পাসপোর্ট আবেদন বাতিল করার জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কিছু ধাপ অনুসরণ করতে হয়। নিচে এই প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে বর্ণনা করা হলো-
ধাপ ১: ই-পাসপোর্ট ওয়েবসাইটে প্রবেশ
- যেকোনো ব্রাউজার (যেমন, গুগল ক্রোম) ওপেন করুন।
- সার্চ বারে “e-passport Bangladesh” টাইপ করে সার্চ করুন।
- প্রথম ফলাফল হিসেবে www.epassport.gov.bd ওয়েবসাইটে ক্লিক করুন।
ধাপ ২: লগইন করুন
- ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার পর “Directly to Online Application” অপশনে ক্লিক করুন।
- “Are You Applying from Bangladesh?” প্রশ্নের উত্তরে “Yes” নির্বাচন করুন (যদি বাংলাদেশ থেকে আবেদন করেন)।
- জেলা এবং থানা নির্বাচন করুন, তারপর “Continue” এ ক্লিক করুন।
- আপনার ইমেইল ঠিকানা এবং পাসওয়ার্ড (যেটি আবেদনের সময় ব্যবহার করেছিলেন) প্রদান করুন।
- “I am Human” বক্সে টিক দিন এবং “Continue” বা “Sign In” এ ক্লিক করুন।
ধাপ ৩: আবেদনের স্ট্যাটাস চেক
- লগইন করার পর আপনার অ্যাকাউন্টে আবেদনের বিস্তারিত তথ্য প্রদর্শিত হবে।
- যদি আবেদনটি ছয় মাসের বেশি পুরোনো হয় বা পাসপোর্ট অফিসে বাতিলের জন্য আবেদন করে থাকেন, তাহলে “Delete” অপশন দেখতে পাবেন।
- “Delete” অপশনে ক্লিক করুন এবং নিশ্চিতকরণের জন্য আবার ক্লিক করুন।
ধাপ ৪: নিশ্চিতকরণ
- আবেদন ডিলিট করার পর একটি নিশ্চিতকরণ বার্তা পাবেন।
- এরপর নতুন করে পাসপোর্ট আবেদন করতে পারবেন।
(৪) পাসপোর্ট ফি ফেরত পাওয়া যায় কি?
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পাসপোর্ট ফি ফেরত প্রাপ্তি। যদি আবেদনের জন্য ফি জমা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বাতিলের ক্ষেত্রে ফি ফেরত পাওয়া খুবই কঠিন। বিশেষ করে, যদি ফি অনলাইনে (যেমন, ekpay) জমা দেওয়া হয়, তাহলে তা ফেরতযোগ্য নয়। তবে, ব্যাংকের মাধ্যমে জমা দেওয়া চালান ছয় মাসের জন্য বৈধ থাকে, যা নতুন আবেদনে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এজন্য ফি জমা দেওয়ার আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল তথ্য বা পরিকল্পনার পরিবর্তন হলে ফি জমা দেওয়ার আগে আবেদন বাতিল করা উচিত।
(৫) পাসপোর্ট অফিসে ম্যানুয়ালি আবেদন করার প্রক্রিয়া
যদি কেউ অনলাইনের পরিবর্তে পাসপোর্ট অফিসে ম্যানুয়ালি আবেদন করতে চান, তাহলে নিম্নলিখিত ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে-
ধাপ ১: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ
- জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন সনদের মূল ও ফটোকপি।
- পাসপোর্ট আবেদন ফর্ম (আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে সংগ্রহ করা যাবে)।
- পাসপোর্ট ফি জমার রসিদ (নির্দিষ্ট ব্যাংকে জমা দিতে হবে)।
- পেশাগত প্রমাণপত্র (যেমন, ছাত্র আইডি, চাকরির আইডি, বা ট্রেড লাইসেন্স)।
- বিবাহিত হলে কাবিননামার ফটোকপি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
ধাপ ২: ফর্ম পূরণ ও জমা
- পাসপোর্ট অফিস থেকে ফর্ম সংগ্রহ করে সঠিকভাবে পূরণ করুন।
- ফর্মের শেষ পৃষ্ঠায় স্বাক্ষর ও তারিখ দিন।
- সমস্ত কাগজপত্রসহ ফর্মটি পাসপোর্ট অফিসে জমা দিন।
ধাপ ৩: বায়োমেট্রিক তথ্য প্রদান
- নির্ধারিত তারিখে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে ছবি, আঙুলের ছাপ, এবং আইরিশের ছবি প্রদান করুন।
- বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে একটি ডেলিভারি স্লিপ দেওয়া হবে।
ধাপ ৪: পাসপোর্ট সংগ্রহ
- পাসপোর্ট প্রস্তুত হলে মোবাইল নম্বরে এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হবে।
- ডেলিভারি স্লিপ নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে পাসপোর্ট সংগ্রহ করুন।
(৬) পাসপোর্ট আবেদন বাতিলের সুবিধা ও অসুবিধা
সুবিধা:
- ভুল সংশোধনের সুযোগ: ভুল তথ্য সংশোধন করে সঠিক তথ্য দিয়ে নতুন আবেদন করা যায়।
- পরিকল্পনার পরিবর্তন: পাসপোর্টের প্রয়োজন না থাকলে আবেদন বাতিল করে পরবর্তী সময়ে নতুন আবেদন করা সম্ভব।
- অনলাইন সুবিধা: ছয় মাস পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিলিট অপশন চালু হয়, যা পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার ঝামেলা কমায়।
অসুবিধা:
- ফি ফেরতের সমস্যা: অনলাইনে জমা দেওয়া ফি ফেরত পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
- সময়ের অপচয়: ম্যানুয়ালি বাতিল প্রক্রিয়ায় ৭-১৪ দিন সময় লাগতে পারে।
- ঝামেলা: পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে দরখাস্ত জমা দেওয়া এবং ফলোআপ করা সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
(৭) সতর্কতা ও পরামর্শ
- সঠিক তথ্য প্রদান: আবেদন ফর্ম পূরণের সময় সতর্কতার সাথে তথ্য প্রদান করুন। ভুল তথ্যের কারণে পুলিশ ভেরিফিকেশন বা পাসপোর্ট প্রিন্টে সমস্যা হতে পারে।
- ফি জমার আগে সিদ্ধান্ত: পাসপোর্ট ফি জমা দেওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন যে আপনি পাসপোর্ট করতে চান।
- দালাল এড়িয়ে চলুন: পাসপোর্ট বাতিল বা সংশোধনের জন্য দালালের কাছে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সরাসরি পাসপোর্ট অফিসে যোগাযোগ করুন।
- নিয়মিত স্ট্যাটাস চেক: আবেদন বাতিলের পর স্ট্যাটাস চেক করতে www.epassport.gov.bd ওয়েবসাইটে নিয়মিত লগইন করুন।
(৮) শেষকথা
ই-পাসপোর্ট বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণকে আরও সহজ ও দ্রুত করেছে। এর মাধ্যমে ই-গেট ব্যবহার করে বিমানবন্দরে দ্রুত ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা যায়। তবে, ভুল তথ্যের কারণে পাসপোর্ট প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই, আবেদনের সময় সঠিক তথ্য প্রদান এবং প্রয়োজনে বাতিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ।
ই-পাসপোর্ট আবেদন বাতিল করা একটি সহজ প্রক্রিয়া, তবে সঠিক ধাপ এবং সতর্কতা অনুসরণ করা প্রয়োজন। ছোটখাটো ভুল সংশোধনের জন্য পাসপোর্ট অফিসে যোগাযোগ করা যায়, আর বড় ভুল বা পরিকল্পনার পরিবর্তনের জন্য আবেদন বাতিল করতে হয়। এই গাইডে উল্লেখিত ধাপগুলো অনুসরণ করলে আবেদনকারীরা সহজেই তাদের ই-পাসপোর্ট আবেদন বাতিল করতে পারবেন।
আরও পাসপোর্ট ও ভিসা সংক্রান্ত তথ্যের জন্য নিয়মিত আমাদের ব্লগ ফলো করুন। আপনার অভিজ্ঞতা বা প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট সেকশনে জানান।









