মুসলমানরা কি কাবার পূজা করে? জেনে নিন আসল সত্য!

ইসলাম যেখানে আকার বা মূর্তি পূজাকে প্রত্যাখ্যান করে সেখানে তারা নিজেরাই কেন তাদের প্রার্থনায় কাবার প্রতি নত হয়ে তার উপাসনা করে?
অনেকের মনেই একটা খুব সাধারণ কিন্তু কৌতূহলী প্রশ্ন জাগে—”ইসলাম ধর্মে তো মূর্তিপূজা বা কোনো আকার-আকৃতির উপাসনা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাহলে মুসলমানরা কেন নামাজের সময় সেই কাবা শরীফের দিকেই নত হয়? তারা কি তবে কাবার পূজা করে?”
আজকের এই লেখায় আমরা খুব সহজ ভাষায় এই ভুল ধারণাটি ভাঙার চেষ্টা করব এবং জানব এর পেছনের আসল যুক্তিগুলো কী। চলুন, খোলা মনে বিষয়টি জেনে নিই।
১. কাবা হলো ‘কেবলা’ বা দিক-নির্দেশক, কোনো উপাস্য নয়
প্রথমেই যে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া দরকার তা হলো, মুসলমানরা কাবার পূজা করে না; তারা কাবার দিকে মুখ করে আল্লাহর ইবাদত করে। কাবা হলো মুসলমানদের জন্য একটি ‘কেবলা’ বা দিক।
উদাহরণস্বরূপ, আপনি যখন কোথাও ভ্রমণ করেন, তখন দিক চেনার জন্য যেমন কম্পাস বা ম্যাপ ব্যবহার করেন, ঠিক তেমনি নামাজের সময় সব মুসলমান একমুখী হওয়ার জন্য কাবার সাহায্য নেয়। মুসলমানরা সেই কালো পাথরের ঘরটির উপাসনা করে না, বরং সেই ঘরের মালিক যিনি, সেই অদৃশ্য মহান আল্লাহ তায়ালার উপাসনা করে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পরিষ্কারভাবে বলেছেন, “…এখন আমরা কি তোমাকে ঘুরিয়ে দেব সেই কেবলার দিকে যা তোমাকে সন্তুষ্ট করবে? তাহলে ঘুরিয়ে নাও তোমরা থাকনা কেন (নামাজে) তার দিকেই মুখ ফিরিয়ে নেবে।” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৪৪]। অর্থাৎ, এটি শুধুই একটি নির্দেশিত দিক।
২. বিশ্বজুড়ে একতা ও শৃঙ্খলার প্রতীক
একটু ভাবুন তো, যদি নামাজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিক ঠিক করা না থাকত, তাহলে কী হতো?
ধরা যাক, একটি বড় মসজিদে হাজার হাজার মানুষ নামাজ পড়তে দাঁড়িয়েছে। এখন কাবার কোনো নির্দেশ না থাকলে, কেউ হয়তো উত্তর দিকে মুখ করত, কেউ দক্ষিণ দিকে, আবার কেউ পূর্ব বা পশ্চিমে। বিষয়টি কি দেখতে খুব বিশৃঙ্খল লাগত না?
ইসলাম হলো একতা ও শৃঙ্খলার ধর্ম। বিশ্বের যে প্রান্তেই মুসলমানরা থাকুক না কেন—আমেরিকা, বাংলাদেশ কিংবা জাপান—সবাই যখন নামাজের সময় দাঁড়ায়, তারা এক আল্লাহর উদ্দেশ্যে একই দিকে (কাবার দিকে) মুখ করে দাঁড়ায়।
- যারা কাবার পশ্চিমে থাকে, তারা পূর্ব দিকে মুখ করে।
- যারা পূর্বে থাকে, তারা পশ্চিমে মুখ করে।
- যারা উত্তরে, তারা দক্ষিণে আর দক্ষিণের মানুষ উত্তরে।
অর্থাৎ, পুরো পৃথিবীর মুসলমানরা একটি কেন্দ্রবিন্দুতে এসে মিলে যায়। এটি মুসলিম উম্মাহর চূড়ান্ত ঐক্যের প্রতীক।
৩. পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু এবং মানচিত্রের রহস্য
আপনাদের জেনে অবাক লাগবে যে, প্রাচীনকালে মুসলমানরাই যখন প্রথম পৃথিবীর মানচিত্র এঁকেছিল, তখন তারা দক্ষিণ দিককে ওপরে এবং উত্তর দিককে নিচে রাখত। সেই হিসেবে কাবা ছিল একদম পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুতে।
পরবর্তীতে পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা যখন ম্যাপ আঁকল, তারা উত্তর দিককে ওপরে রাখল। মজার ব্যাপার হলো, ম্যাপ উল্টে গেলেও বা দিক পরিবর্তন হলেও, ভৌগোলিকভাবে কাবা শরিফ কিন্তু পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুতেই থেকে গেছে। এটি মহান আল্লাহর এক অলৌকিক নিদর্শন।
৪. তাওয়াফ: এক আল্লাহর ওপর বিশ্বাসের প্রমাণ
হজের সময় বা ওমরাহ করতে গিয়ে মুসলমানরা কাবার চারদিকে ঘোরে, যাকে ‘তাওয়াফ’ বলা হয়। এর মানে কি এই যে তারা ঘরটির পূজা করছে? একদমই না।
গণিতের ভাষায়, প্রতিটি বৃত্তের একটিই কেন্দ্র থাকে। মুসলমানরা যখন কাবার চারদিকে ঘোরে, তখন তারা মূলত এটাই প্রমাণ করে যে, কেন্দ্র যেমন একটি, তেমনি আমাদের রব বা প্রভুও মাত্র একজন। এই ঘূর্ণন এক আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসের একটি প্র্যাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক রূপ মাত্র।
৫. হযরত উমর (রা.)-এর সেই বিখ্যাত উক্তি
মুসলমানরা যে পাথর বা কাঠামোর পূজা করে না, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর একটি কথায়। তিনি হাজরে আসওয়াদ বা কাবার কালো পাথরটির সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন-
“আমি জানি তুমি একটি পাথর খণ্ড মাত্র। তুমি না কারো কোনো উপকার করতে পারো, আর না কোনো ক্ষতি। আমি যদি না দেখতাম খোদ আল্লাহর রাসূল (সা.) তোমাকে স্পর্শ করেছেন, তাহলে কস্মিনকালেও আমি তোমাকে স্পর্শ করতাম না।” (বুখারী শরীফ)
একজন মূর্তিপূজারী কি কখনো তার উপাস্য দেবতাকে বলবে যে, “তুমি কেবলই একটি পাথর”? কখনোই না। উমর (রা.)-এর এই কথাই প্রমাণ করে যে, মুসলমানদের মনে কাবার প্রতি সম্মান আছে, কিন্তু কোনো পূজার ভাব নেই।
৬. কাবার ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আজান!
সবশেষে একটি খুব সাধারণ যুক্তির কথা বলি, যা শুনলে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকবে না।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে হযরত বেলাল (রা.) কাবার ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আজান দিতেন। এখন নিজেকে প্রশ্ন করুন—
কোনো মূর্তিপূজারী কি কখনো তার পূজোর মূর্তির মাথার ওপর বা কাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে কাউকে ডাকবে? এটা কি সেই মূর্তির জন্য চরম অপমান নয়? অবশ্যই!
যেহেতু মুসলমানরা কাবার ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আজান দিয়েছে, তাই এটিই প্রমাণ করে যে কাবা কোনো উপাস্য দেবতা নয়। এটি কেবল একটি সম্মানিত ঘর যা আমাদের একতাবদ্ধ করে।
শেষ কথা
আশা করি এই আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি এখন জলের মতো পরিষ্কার। মুসলমানরা কাবার পূজা করে না, বরং কাবাকে একটি কেন্দ্রবিন্দু মেনে এক আল্লাহর উপাসনা করে। এটি বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের একতা, শৃঙ্খলা এবং একত্ববাদের প্রতীক।





![চন্দ্রকে নূরের তৈরি এবং সূর্যকে প্রদীপ বা আগুণ বলা হয়েছে, চন্দ্র নূরের তৈরি নয় এবং সূর্যের পুরো অংশ আগুন নয়, তাহলে কোরানের একথা কিভাবে সত্য হল? [৭১:১৫-১৬; ২৫:৬১] চন্দ্রকে নূরের তৈরি এবং সূর্যকে প্রদীপ বা আগুণ বলা হয়েছে। চন্দ্র নূরের তৈরি নয় এবং সূর্যের](https://informationbangla.com/wp-content/uploads/2023/03/চন্দ্রকে-নূরের-তৈরি-এবং-সূর্যকে-প্রদীপ-বা-আগুণ-বলা-হয়েছে।-চন্দ্র-নূরের-তৈরি-নয়-এবং-সূর্যের.jpg)



