হিন্দু সুরক্ষা কমিটির নামে ভারত থেকে আমদানি হচ্ছে উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও গেরুয়া সন্ত্রাস

ঢাকা – বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই ধর্মীয় সম্প্রীতি, বহুত্ববাদ এবং পারস্পরিক সহাবস্থানের এক অনন্য ভূখণ্ড। এদেশের আকাশে-বাতাসে লালিত হয়েছে সুফিবাদের উদারতা এবং সনাতন ধর্মের অহিংস বাণী। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং সার্বভৌমত্বের দেয়ালে এক নতুন ধরনের আঘাত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ‘হিন্দু সুরক্ষা কমিটি’ বা ‘হিন্দু সুরক্ষা সমিতি’র মতো কিছু ভূঁইফোড় সংগঠনের আড়ালে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে এক চরমপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শ—উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও গেরুয়া সন্ত্রাস আমদানির এক বিপজ্জনক অপচেষ্টা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
‘সুরক্ষা’র আড়ালে রাজনৈতিক উস্কানি
সংখ্যালঘু সুরক্ষার আন্তর্জাতিক ও সাংবিধানিক অধিকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই সংগঠনগুলো মূলত একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইছে। এদের মূল লক্ষ্য এদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী সাধারণ মানুষকে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি কৃত্রিম ভীতি ও ক্ষোভের পরিবেশ তৈরি করা।
সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এদের ভাষা, স্লোগান এবং প্রতীকী উপস্থাপনা কোনোটিই বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী হিন্দু সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির সাথে মেলে না। বরং তা সম্পূর্ণভাবে ভারতের উগ্র ডানপন্থী সংগঠনগুলোর অনুসরণে তৈরি। এর ফলে শান্তিকামী সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে পড়ছেন, যেখানে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের উগ্রতার দায় পুরো সম্প্রদায়ের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়।
গেরুয়া সংস্কৃতির আগ্রাসন
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন স্থিরচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে এই প্রাতিষ্ঠানিক উগ্রবাদের বিস্তার পরিষ্কার হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা নিচের ফাইলটির দিকে তাকাতে পারি।

এই চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ‘হিন্দু সুরক্ষা সমিতি’র ব্যানারের সামনে একদল যুবক ও বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন, যাদের অধিকাংশের গলায় শোভা পাচ্ছে উগ্র হিন্দুত্ববাদের প্রতীক হিসেবে পরিচিত গেরুয়া রঙের উত্তরীয়। ব্যানারটির ভাষা এবং উপস্থিত ব্যক্তিদের শারীরিক ভাষা স্পষ্ট করে দেয় যে, এটি কোনো সাধারণ ধর্মীয় বা সামাজিক মেলবন্ধন নয়; বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মহড়া।
এই গেরুয়া উত্তরীয় বা প্রতীকগুলোর ব্যবহার বাংলাদেশের চিরাচরিত উৎসবমুখর ধর্মীয় আবহকে কালিমালিপ্ত করছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে ‘গেরুয়া সন্ত্রাস’ বা ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি দেখা যায়, হুবহু সেই একই মডেল বাংলাদেশে আমদানি করার এই চাক্ষুষ প্রমাণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সার্বভৌমত্বের অবমাননা
এই উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো তাদের রাষ্ট্রদ্রোহী ও সার্বভৌমত্ব-বিরোধী অবস্থান। সম্প্রতি এই চক্রের কিছু স্থানীয় নেতার ভিডিও বার্তা প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে তারা এদেশেরই সন্তান হয়ে, এদেশে বসবাস করে এবং এদেশেরই নাগরিক সুবিধা ভোগ করে প্রতিবেশী দেশের কট্টরপন্থী নেতাদের কাছে (যেমন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী) বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নালিশ জানাচ্ছে।
- বিদেশি হস্তক্ষেপের আহ্বান: নিজেদের দেশের আইন, প্রশাসন বা বিচার ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে, ভিনদেশী রাজনৈতিক শক্তির কাছে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ‘উচ্ছেদ’ বা দমন করার অবদার জানানো সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।
- দ্বিমুখী নীতি ও প্রশাসনিক শিথিলতা: সচেতন নাগরিক সমাজের মধ্যে এই প্রশ্নটি জোরালো হয়ে উঠেছে যে, যদি কোনো মুসলিম নাগরিক একইভাবে অন্য দেশের কাছে দেশের কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ বা উস্কানিমূলক নালিশ জানাতো, তবে রাষ্ট্র ও প্রশাসন মুহূর্তের মধ্যে তাকে ‘রাজাকার’ বা ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে কঠোরতম শাস্তির মুখোমুখি করতো। কিন্তু এই উগ্র হিন্দুত্ববাদী উপাদানগুলো অনায়েসে দেশের ভেতর বসে দেশের নাগরিকদের থ্রেট বা হুমকি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে, যা আইনের শাসনের ক্ষেত্রে এক ধরণের বৈষম্যমূলক চিত্র তৈরি করে।
ভূ-রাজনৈতিক যোগসূত্র ও আরএসএস বিজেপির এজেন্ডা
এই গেরুয়া সন্ত্রাসের আমদানি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তাদের মাতৃসংগঠন আরএসএস (RSS)-এর ‘অখণ্ড ভারত’ ও ‘হিন্দুত্ববাদ’ প্রতিষ্ঠার যে দীর্ঘমেয়াদী এজেন্ডা রয়েছে, এটি তারই একটি অংশ।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভোট ব্যাংক ভারী করা এবং ধর্মীয় মেরুকরণ বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশকে সবসময় একটি ‘সফট টার্গেট’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে ওপার থেকে যে উগ্র ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়, এদেশের কিছু পেইড এজেন্ট বা উগ্রবাদী গোষ্ঠী তা এপারে বাস্তবায়ন করতে চায়। তারা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় যাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক সবসময় একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে থাকে।
করণীয় ও উত্তরণের পথ
বাংলাদেশকে যদি উগ্রবাদের এই বিষাক্ত ছোবল থেকে রক্ষা করতে হয়, তবে রাষ্ট্র ও জনগণকে এখনই সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে:
- কঠোর আইনি পদক্ষেপ: যারা সুনির্দিষ্টভাবে দেশের বাইরে নালিশ পাঠিয়ে সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং ধর্মীয় দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করছে, তাদের ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে প্রচলিত আইনে দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
- গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার: ‘হিন্দু সুরক্ষা কমিটি’র মতো সংগঠনগুলোর অর্থের উৎস, ভারতের উগ্রপন্থী দলগুলোর সাথে এদের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এদের উস্কানিমূলক প্রচারণার নেপথ্যের নায়কদের খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে।
- সম্প্রীতি রক্ষা ও সচেতনতা: সাধারণ মুসলিম ও হিন্দু জনগোষ্ঠীকে বুঝতে হবে যে, এই উগ্রবাদ কোনো ধর্মের কল্যাণ সাধনের জন্য নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ব্যবসা। মুষ্টিমেয় কিছু অপরাধীর জন্য যেন কোনোভাবেই সাধারণ নিরীহ নাগরিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে নাগরিক সমাজকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
বাংলাদেশ কোনো ভিনদেশী উগ্র মতাদর্শের পরীক্ষাগার হতে পারে না। ‘গেরুয়া সন্ত্রাস’ বা ‘উগ্র হিন্দুত্ববাদ’ আমদানির এই নগ্ন চেষ্টা যদি এখনই কঠোর হস্তে দমন করা না হয়, তবে তা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে ঠেলে দেবে। মায়ের কোলে বসে মায়ের নামে নালিশ করা এই বিশ্বাসঘাতকদের রুখে দেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।







