উগ্র হিন্দুত্ববাদের দখলে ২০১৪ সালের পরের নতুন ভারত

দিল্লি – বর্তমানের ভারতে মাটিতে নেমে দেখলে বা গ্রাউন্ড রিয়ালিটি (ground reality) পর্যবেক্ষণ করলে উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও মুসলিম বিদ্বেষ—যেমন অর্থনৈতিক বয়কট (মুসলিম দোকানদারদের থেকে পণ্য না কেনা), জমি বা বাড়ি বিক্রি করতে বাধা দেওয়া, কিংবা প্রকাশ্য জনসভায় উগ্র রাজনৈতিক স্লোগান—এগুলো কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এগুলো অত্যন্ত নির্মম এবং দৃশ্যমান বাস্তব।
যখন রাজনৈতিক সুবিধা বা প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতায় এই ধরনের ঘৃণার চর্চা প্রকাশ্যে করা হয়, তখন মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক যে পুরো সমাজটাই বুঝি বিষাক্ত হয়ে গেছে। এই গভীর উদ্বেগ এবং ক্ষোভের একটি যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে।
একটি সমাজে যখন কোনো উগ্র মতাদর্শ ক্ষমতা এবং প্রচারমাধ্যমের সমর্থন পায়, তখন তাদের কণ্ঠস্বর সবচেয়ে জোরালো হয়। রাস্তায় যারা দলবদ্ধ হয়ে হাঙ্গামা করে, উস্কানিমূলক স্লোগান দেয় বা সামাজিক বয়কটের ডাক দেয়, তারা সংখ্যায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, ঘরে বসে থাকা প্রতিটি সাধারণ মানুষও একই তীব্রতায় সেই উগ্রতা বা জাতিগত নিধনের চিন্তা লালন করছেন। অনেকেই হয়তো সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাপে চুপ থাকেন, কিন্তু মনে মনে এই উন্মাদনা সমর্থন করেন না।
যেকোনো উগ্র ডানপন্থী বা চরমপন্থী গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্যই হলো সমাজকে এমনভাবে মেরুকরণ করা, যাতে দুই পক্ষের সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে—”ওরা সবাই আমাদের শত্রু।” তারা ঠিক এই মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন এবং চূড়ান্ত অবিশ্বাসটাই তৈরি করতে চায়।
ভারতে ধর্মীয় মেরুকরণ এবং মুসলিম-বিদ্বেষ বর্তমানে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে—এটি একটি অনস্বীকার্য এবং উদ্বেগজনক সত্য।
২০১৪ সালের পরবর্তী সময়ে ভারতের রাজনৈতিক এবং সামাজিক দৃশ্যপটে যে একটি বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে, এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে মেরুকরণের রাজনীতি আগের চেয়ে তীব্র হয়েছে—এটি একটি বহুল আলোচিত ও দৃশ্যমান বাস্তবতা। গত এক যুগে মূলধারার কিছু গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রচারণার কারণে সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব পড়েছে। এখন কৌশলে সাধারণ হিন্দুদের মগজের মধ্য মুসলমানদের প্রতি মনের মধ্যে ঘৃণা এবং বিদ্বেষ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রীতি ও বিশ্বাসকে নষ্ট করা হয়েছে।
প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচারের ক্ষমতা এতটাই শক্তিশালী যে, এটি সাময়িকভাবে একটি বড় জনগোষ্ঠীর চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিগত ১২ বছরে তথাকথিত ‘আইটি সেল’ এবং কিছু গদি সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে দিনরাত যে ধরণের মুসলিম-বিদ্বেষী ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করা হয়েছে, তা সাধারণ ও নিরপেক্ষ মানুষের চিন্তাভাবনাকেও কিছুটা প্রভাবিত করেছে। উগ্রপন্থীরা সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের কাল্পনিক “ভয়” তৈরি করতে সফল হয়েছে। যখন মানুষ ভয়ের মধ্যে থাকে, তখন তার যুক্তি বুদ্ধি কিছুটা লোপ পায়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, তারা সবাই জন্মগতভাবে বা স্থায়ীভাবে উগ্র হয়ে গেছেন; বরং তারা একটি শক্তিশালী প্রোপাগান্ডা মেশিনের শিকার।
একটি সমাজে যখন উগ্রতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তখন যারা সম্প্রীতি ও শান্তির পক্ষে কথা বলেন, তারা প্রায়ই কোণঠাসা হয়ে পড়েন। বহু সাধারণ মানুষ এই উগ্র পরিবেশ পছন্দ না করলেও নিজেদের বা পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে চুপ থাকেন। এই নীরবতাকে উগ্রতার “প্রকাশ্য সমর্থন” হিসেবে ধরে নিলে ভুল হবে।
পৃথিবীর ইতিহাসে জার্মানি বা রুয়ান্ডার মতো দেশেও একসময় তীব্র প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উগ্র করে তোলা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাভাবিক সহাবস্থানের তাগিদ এবং মানবিকতা পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না। বর্তমানের এই অন্ধকার সময়েও বহু হিন্দু নাগরিক, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ এই ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। তাই আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

