বস্তুর ক্ষমতা, রোগ সংক্রমণ, রাশি ও গ্রহ নক্ষত্রের প্রভাব, হস্তরেখা বিচার, রত্ন ও পাথরের প্রভাব, তাবীজ ও ঝাড়-ফুঁক, নযর ও বাতাস লাগা, কুলক্ষণ ও সুলক্ষণ ইত্যাদি সম্পর্কে ইসলাম কি বলে?

প্রিয় পাঠক বন্ধুরা, আজকের এই পোষ্টটিতে আমরা বস্তুর ক্ষমতা, রোগ সংক্রমণ, রাশি ও গ্রহ নক্ষত্রের প্রভাব, হস্তরেখা বিচার, রত্ন ও পাথরের প্রভাব, তাবীজ ও ঝাড়-ফুঁক, নযর ও বাতাস লাগা, কুলক্ষণ ও সুলক্ষণ ইত্যাদি সম্পর্কে ইসলাম কি বলে, তা সম্পর্কে আলোচনা করব, ইশাআল্লাহ।
চলুন শুরু করা যাক-
(১) বস্তুর ক্ষমতা সম্পর্কে ইসলাম
- কোন আস্বাব বা বস্তুর নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই।
- কোন আস্বাব বা বস্তুর নিজস্ব ক্ষমতা আছে- এরূপ বিশ্বাস করা শির্ক।
- তবে বস্তুর মধ্যে যে ক্ষমতা দেখা যায় বা বস্তু থেকে যে প্রভাব প্রকাশ পায় তা আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক প্রদত্ত, তার নিজস্ব ক্ষমতা নয়।
(২) রোগ সংক্রমণ সম্পর্কে ইসলাম
সাধারণতঃ ছোঁয়াচে রোগ বা সংক্রামক ব্যাধি সম্বন্ধে যে ধারণা রয়েছে সে ব্যাপারে ইসলামের আকীদা হলো- কোন রোগের মধ্যে সংক্রমণের নিজস্ব ক্ষমতা নেই। তাই দেখা যায় তথাকথিত সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত লোকের কাছে যাওয়ার পরও অনেকে আক্রান্ত হয়না, আবার অনেকে না যেয়েও আক্রান্ত হয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে সহীহ্ আকীদা হলো- রোগের মধ্যে সংক্রমণ বা অন্যের মধ্যে বিস্তৃত হওয়ার নিজস্ব ক্ষমতা নেই। কেউ অনুরূপ রোগীর সংস্পর্শে গেলে যদি তার আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর ফয়সালা হয়, সে ক্ষেত্রেই সে আল্লাহর হুকুমে আক্রান্ত হবে, অন্যথায় আক্রান্ত হবেনা।
এরূপ আকীদা রাখতে হবে যে, এসব রোগের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে আল্লাহ তা’আলা সংক্রমণের এই নিয়ম রেখে দিয়েছেন। তবে আল্লাহর ইচ্ছা হলোে সংক্রমণ নাও ঘটতে পারে। অর্থাৎ, সংক্রমণের এ ক্ষমতা রোগের নিজস্ব ক্ষমতা নয়, এর পশ্চাতে আল্লাহর দেয়া ক্ষমতা এবং তাঁর ইচ্ছার দখল থাকে।
তবে ইসলাম প্রচলিত এসব সংক্রামক রোগে আক্রান্ত লোকদের নিকট যেতে নিষেধ করেছে বিশেষভাবে কুষ্ঠ রোগীর নিকট, এ কারণে যে, রোগীর নিকট গেলে আর তার আক্রান্ত হওয়ার খোদায়ী ফয়সালা হওয়ার কারণেই সে আক্রান্ত হলোে তার ধারণা হতে পারে যে, উক্ত রোগীর সংস্পর্শে যাওয়ার কারণেই সে আক্রান্ত হয়েছে। এভাবে তার আকীদা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তা যেন না হতে পারে এ জন্যেই ইসলাম এরূপ বিধান দিয়েছে।
তবে কেউ মজবুত আকীদার অধিকারী হলোে সে অনুরূপ রোগীর নিকট যেতে পারে।
এমনিভাবে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত লোককেও সুস্থ এলাকার লোকদের নিকট যেতে নিষেধ করা হয়েছে, যাতে অন্য কারও আকীদা নষ্টের কারণ না ঘটে।
(৩) রাশি ও গ্রহ নক্ষত্রের প্রভাব সম্পর্কে ইসলাম
- “রাশি” বলা হয় সৌর জগতের কতগুলো গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতীককে। এগুলো কল্পিত। এরূপ বারটি রাশি কল্পনা করা হয়। যথাঃ মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীন। এগুলোকে বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতীক সাব্যস্ত করা হয়েছে।
- জ্যোতিশাস্ত্র (অর্থাৎ, ফলিত জ্যোতিষ এর ধারণা অনুযায়ী এ সব গ্রহ নক্ষত্রের গতি, স্থিতি ও সঞ্চারের প্রভাবে ভবিষ্যত শুভ-অশুভ সংঘটিত হয়ে থাকে। নিউমারোলজি বা সংখ্যা জ্যোতিষের উপর ভিত্তি করে এই শুভ-অশুভ নির্ণয় তথা ভাগ্য বিচার করা হয়।
- ইসলামী আকীদা অনুসারে গ্রহ-নক্ষত্রের মধ্যে নিজস্ব কোন প্রভাব বা ক্ষমতা নেই। সুতরাং ভাগ্য তথা শুভ-অশুভ গ্রহ নক্ষত্রের প্রভাবে ঘটে এই আকীদা রাখা শির্ক।
- গ্রহ-নক্ষত্রের মধ্যে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত এরূপ কোন প্রভাব থাকলে থাকতেও পারে কিন্তু তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। যা কিছু বলা হয় সবই কাল্পনিক। যদি প্রকৃতই এরূপ কোন প্রভাব থাকেও, তবুও তা আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত, গ্রহ নক্ষত্রের নিজস্ব ক্ষমতা নয়। অতএব শুভ-অশুভ
- মৌলিকভাবে আল্লাহরই ইচ্ছাধীন ও তাঁরই নিয়ন্ত্রণে। গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব ও রাশি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন “ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ” নামক গ্রন্থ।
(৪) হস্তরেখা বিচার সম্পর্কে ইসলাম
পামিস্ট্রি (Palmistry) বা হস্তরেখা বিচার বিদ্যার মাধ্যমে গণকগণ কর্তৃক যে হাতের রেখা ইত্যাদি দেখে ভাগ্যের বিষয় ও ভূত-ভবিষ্যতের শুভ-অশুভ সম্পর্কে বিশ্লেষণ দেয়া হয়, ইসলামে এরূপ বিষয়ে বিশ্বাস রাখা কুফরী।
(৫) রত্ন ও পাথরের প্রভাব সম্পর্কে ইসলাম
মণি, মুক্তা, হীরা, চুনি, পান্না, আকীক প্রভৃতি পাথর ও রত্ন মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে, মানুষের ভাগ্যে পরিবর্তন ঘটায়- এরূপ আকীদা- বিশ্বাস রাখা মুশরিকদের কাজ, মুসলমানদের নয়।
(৬) তাবীজ ও ঝাড়-ফুঁক সম্পর্কে ইসলাম
- তা’বীজ ও ঝাড়-ফুঁকে কাজ হওয়াটা নিশ্চিত নয়- হতেও পারে নাও হতে পারে।
- যেমন দোয়া করা হলোে রোগ-ব্যাধি আরোগ্য হওয়াটা নিশ্চিত নয়, আল্লাহর ইচ্ছা হলোে আরোগ্য হয় নতুবা হয়না। তদ্রূপ তা’বীজ এবং ঝাড় ফুঁকও একটি দোয়া বরং তা’বীজের চেয়ে দু’আ বেশী শক্তিশালী।
- তা’বীজ এবং ঝাড়-ফুঁকে কাজ হলোেও সেটা তা’বীজ বা ঝাড় ফুঁকের নিজস্ব ক্ষমতা নয় বরং আল্লাহর ইচ্ছাতেই সবকিছু হয়ে থাকে।
- সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সব তাবীজ ও ঝাড়-ফুঁক এজতেহাদ এবং অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত, কুরআন ও হাদীসে যার ব্যাপারে স্পষ্ট বলা হয়নি যে, অমুক তা’বীজ বা অমুক ঝাড়-ফুঁক দ্বারা অমুক কাজ হবে। অতএব কোন তা’বীজ বা ঝাড়-ফুঁক দ্বারা কাংখিত ফল লাভ না হলোে এরূপ বলার বা এরূপ ভাবার অবকাশ নেই যে, কুরআন-হাদীস কি তাহলে সত্য নয়?
- তা’বীজ ও ঝাড়-ফুঁক কুরআন-হাদীসের বাক্যাবলী দ্বারা বৈধ উদ্দেশ্যে করা হলোে তা জায়েজ। পক্ষান্তরে কোন কুফ্র শিরকের কথা থাকলে বা এরূপ কোন যাদু হলোে তা দ্বারা তা’বীজ ও ঝাড়-ফুঁক হারাম।
- এমনিভাবে কোন অবৈধ উদ্দেশ্য হাছিলের জন্য তাবীজ ও ঝাড়-ফুঁক করা হলোে তা জায়েয নয়, যদিও কুরআন-হাদীসের বাক্য দ্বারা তা করা হয়।
- যে সব বাক্য বা শব্দ কিংবা যে সব নকশার অর্থ জানা যায়না, তা দ্বারা তাবীজ ও ঝাড়-ফুঁক করা বৈধ নয়।
- কোন বিষয়ের তা’বীজ বা ঝাড়-ফুঁকের জন্য কোন নির্দিষ্ট দিন বা সময় রয়েছে বা বিশেষ কোন শর্ত ইত্যাদি রয়েছে- এরূপ মনে করা ঠিক নয়।
- তা’বীজ বা ঝাড়-ফুঁকের জন্য কারও এজাযাত প্রাপ্ত হওয়া জরুরী এরূপ ধারণাও ভুল।
- তাবীজ বা ঝাড়-ফুঁক দ্বারা ভাল আছর হলোে সেটাকে তাবীজ দাতার বা আমেলের বুযুর্গী মনে করা ঠিক নয়। যা কিছু হয় আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়।
(৭) নযর ও বাতাস লাগা সম্পর্কে ইসলাম
- হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী নযর লাগার বিষয়টি সত্য। জান-মাল ইত্যাদির প্রতি বদনযর লেগে তার ক্ষতি সাধন হতে পারে। আপনজনের প্রতিও আপনজনের বদনযর লাগতে পারে, এমনকি সন্তানের প্রতি মাতা-পিতারও বদনযর লাগতে পারে।
- আর বাতাস লাগার অর্থ যদি হয় জিন ভূতের বাতাস অর্থাৎ, তাদের খারাপ নযর বা খারাপ আছর লাগা, তাহলে এটাও সত্য; কেননা জিন ভূত মানুষের উপর আছর করতে সক্ষম।
- কেউ কারও কোন ভাল কিছু দেখলে যদি (মাশা আল্লাহ) বলে, তাহলে তার প্রতি তার বদন্যর লাগে না।
- কারও উপর কারও বদনযর লেগে গেলে যার নযর লাগার সন্দেহ হয় তার মুখ, হাত (কনুই সহ) এবং শরীরের নীচের অংশ ধুয়ে সেই পানি যার উপর নযর লেগেছে তার উপর ঢেলে দিলে খোদা চাহেতো ভাল হয়ে যাবে।
- বদ নযর থেকে হেফাযতের জন্য কাল সুতা বাধা বা কালি কিংবা কাজলের টিপ লাগানো ভিত্তিহীন ও কুসংস্কার।
(৮) ইসলাম ধর্মে কুলক্ষণ ও সুলক্ষণ বলতে কিছু নেই
- ইসলামী আকীদা মতে কোন বস্তু বা অবস্থা থেকে কুলক্ষণ গ্রহণ করা বা কোন সময়, দিন ও মাসকে খারাপ মনে করা বৈধ নয়। এমনিভাবে হাদীস দ্বারা স্বীকৃত নয়- এরূপ কোন লক্ষণ মানা বৈধ নয়।
- তবে কেউ কোন বিষয়ে চিন্তা ভাবনা বা দুশ্চিন্তায় রয়েছে এরূপ মুহূর্তে ঘটনাক্রমে বা কিছুটা ইচ্ছাকৃতভাবে খুশী বা সাফল্য সূচক কোন শব্দ শ্রুতিগোচর হলোে কিংবা এরূপ কিছু দৃষ্টিগোচর হলোে সেটাকে সুলক্ষণ হিসেবে গ্রহণ করা যায়।
- এটা মূলতঃ কোন শব্দ বা বস্তুর প্রভাবকে বিশ্বাস করা নয়, বরং এটা প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর রহমতের আশাকে শক্তিশালী করা।
(৯) ইসলাম ধর্ম বিরুদ্ধ কয়েকটি লক্ষণ ও কুলক্ষণের তালিকা
ইসলাম ধর্মে এই ধরণের লক্ষণ ও কুলক্ষণের কোন ভিত্তি নেই।
১। হাতের তালু চুলকালে অর্থ-কড়ি আসবে মনে করা।
২। চোখ লাফালে বিপদ-আপদ আসবে মনে করা।
৩। কুকুর কাঁদলে রোগ মহামারী আসবে মনে করা।
৪। এক চিরুনিতে দু’জন চুল আঁচড়ালে উক্ত দু’জনের মধ্যে ঝগড়া লাগবে মনে করা।
৫। কোন বিশেষ পাখি ডাকে মেহমান আসবে মনে করা।
৬। যাত্রা পথে পেছন থেকে কেউ ডাকলে খারাপ মনে করা।
৭। যাত্রা পথে হোঁচট খেলে বা মেথর দেখলে বা কাল কলসি দেখলে, কিংবা বিড়াল দেখলে কুলক্ষণ মনে করা।
৮। অমুক দিন যাত্রা নাস্তি, অমুক দিন বিবাহ নাস্তি, অমুক দিন ভ্রমণ নাস্তি ইত্যাদি বিশ্বাস করা। মোটকথা কোন দিন সময় বা কোন মুহূর্তকে অশুভ মনে করা।
৯। যাত্রার মুহূর্তে কেউ তার সামনে হাঁচি দিলে কাজ হবে না- এরূপ বিশ্বাস করা।
১০। পেঁচা ডাকলে ঘর-বাড়ি বিরান হয়ে যাবে মনে করা।
১১। জিহ্বায় কামড় লাগলে কেউ তাকে গালি দিচ্ছে বা কেউ তাকে স্মরণ করছে মনে করা।
১২। চড়ুই পাখিকে বালুতে গোসল করতে দেখলে বৃষ্টি হবে মনে করা।
১৩। দোকান খোলার পর প্রথমেই বাকি দিলে সারা দিন বাকি বা ফাঁকি যাবে মনে করা। বরং প্রথমেই সহযোগিতার নিয়তে কাউকে বাকি দিলে মানুষকে সহযোগিতার ছওয়াব ও বরকতে তার ব্যবসা ভাল হতে পারে।
১৪। কোন লোকের আলোচনা চলছে, ইত্যবসরে বা কিছুক্ষণ পরে সে এসে পড়লে এটাকে তাকে দীর্ঘজীবি হওয়ার লক্ষণ মনে করা।
১৫। কোন ঘরে মাকড়সার জাল বেশী হলোে উক্ত ঘরের মালিক ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়বে মনে করা।
১৬। আসরের পর ঘরে ঝাড়ু দেয়াকে খারাপ মনে করা।
১৭। ঝাড়ু দ্বারা বিছানা পরিষ্কার করলে ঘর উজাড় হয়ে যাবে মনে করা।
১৮। কোন বাড়িতে বাচ্চা মারা গেলে সে বাড়িতে গেলে নিজের বাচ্চাও মারা যাবে মনে করা।
১৯। ঝাড়ূর আঘাত লাগলে শরীর শুকিয়ে যাবে মনে করা।
২০। কোন প্রাণী বা কোন প্রাণীর ডাককে অশুভ বা অশুভ লক্ষণ মনে করা।
বিঃদ্রঃ এরূপ আরও বহু ভুল আকীদা ও বিশ্বাস রয়েছে, উদাহরণ স্বরূপ এই পোষ্টটিতে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
[তথ্য সূত্র: মাওলানা মুহাম্মদ হেমায়েত উদ্দীন]
