এইডস (AIDS) রোগ আসলে কী, এটি কীভাবে ছড়ায়, এর ইতিহাস কী এবং এটি কোথা থেকে এলো?

পৃথিবীতে এমন কিছু রোগ আছে যা মানুষের ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো এইচআইভি (HIV) এবং এইডস (AIDS)। আশির দশকে যখন এই রোগটি প্রথম ধরা পড়ে, তখন এটি ছিল এক মূর্তিমান আতঙ্ক। কিন্তু গত কয়েক দশকে বিজ্ঞানের অবিশ্বাস্য অগ্রগতির ফলে এই মরণব্যাধিকে এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।
আজকের ব্লগে আমরা খুব সহজ ভাষায় জানব—এইচআইভি আসলে কী, এটি কীভাবে ছড়ায়, এর ইতিহাস কী এবং এটি কোথা থেকে এলো।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
শুরুতেই কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক যা আমাদের এই রোগের ভয়াবহতা বুঝতে সাহায্য করবে। এইডসের সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ কোটি (৭০ মিলিয়ন) মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লক্ষ (৩৫ মিলিয়ন) মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এই সংখ্যাগুলো যেমন বিশাল, তেমনি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের হারানোর গল্প। তবে আশার কথা হলো, সঠিক চিকিৎসা পেলে এটি এখন আর আগের মতো নিশ্চিত মৃত্যুর পরোয়ানা নয়।
এইচআইভি (HIV) আসলে কী?
এইচআইভি-এর পূর্ণ রূপ হলো Human Immunodeficiency Virus। সহজ ভাষায়, এটি এমন একটি ভাইরাস যা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বা আমাদের ‘সুরক্ষাবাহিনী’কে আক্রমণ করে।
আমাদের রক্তে CD4 T cells নামে এক ধরণের শ্বেত রক্তকণিকা থাকে, যাদের আমরা ‘হেল্পার সেল’ বা সাহায্যকারী কোষ বলি। এদের কাজ হলো শরীরে কোনো জীবাণু ঢুকলে অন্য কোষগুলোকে সংকেত দেওয়া যাতে তারা আক্রমণকারীকে ধ্বংস করতে পারে। এইচআইভি ভাইরাস ঠিক এই কোষগুলোকেই দখল করে নেয় এবং তাদের মেরে ফেলে। ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একদম ভেঙে পড়ে।
এটি কীভাবে ছড়ায়? (আর কীভাবে ছড়ায় না!)
এইচআইভি ছড়ানোর নির্দিষ্ট কিছু উপায় আছে। এটি মূলত শরীরের নির্দিষ্ট কিছু তরল পদার্থের মাধ্যমে ছড়ায়:
- রক্ত
- বীর্য (Semen)
- যোনিপথের তরল (Vaginal fluid)
- মায়ের বুকের দুধ
তাই অনিরাপদ যৌন মিলন, ব্যবহৃত ইনজেকশনের সূঁচ বা আক্রান্ত রক্ত নেওয়ার মাধ্যমে এটি ছড়াতে পারে। তবে একটি বড় ভুল ধারণা আছে যে লালার (Saliva) মাধ্যমে এটি ছড়ায়। আসলে আমাদের লালায় এমন কিছু প্রোটিন ও অ্যান্টিবডি থাকে যা এইচআইভি ভাইরাসকে অকেজো করে দেয়। তাই লালার মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ানোর কোনো সুযোগ নেই (যদি না সেখানে প্রচুর পরিমাণে রক্ত মিশ্রিত থাকে)।
এইচআইভি থেকে এইডস: পার্থক্য কী?
অনেকেই এইচআইভি এবং এইডসকে একই মনে করেন, কিন্তু এদের মধ্যে পার্থক্য আছে।
- এইচআইভি (HIV): এটি হলো ভাইরাসের নাম। কেউ আক্রান্ত হলে শুরুতে তার সাধারণ ফ্লু বা জ্বরের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যা কয়েক সপ্তাহে সেরে যায়। এরপর মানুষটি বছরের পর বছর সুস্থ থাকতে পারে।
- এইডস (AIDS): এটি হলো রোগের শেষ পর্যায়। যখন এইচআইভি ভাইরাস শরীরের অধিকাংশ টি-সেল মেরে ফেলে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রায় শূন্য হয়ে যায়, তখন তাকে এইডস বলা হয়। সাধারণত রক্তে টি-সেলের সংখ্যা যখন প্রতি মাইক্রোলিটারে ২০০-এর নিচে নেমে যায়, তখন ডাক্তাররা এইডস হিসেবে শনাক্ত করেন।
এই অবস্থায় সাধারণ সর্দি-কাশি বা সামান্য ছত্রাকজনিত সংক্রমণও মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে, কারণ শরীর তখন আর লড়াই করতে পারে না।
এইডস এর শুরু আশির দশকে
১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ডাক্তাররা লক্ষ্য করলেন যে, ক্যালিফোর্নিয়া এবং নিউইয়র্কের তরুণ স্বাস্থ্যবান পুরুষদের মধ্যে অদ্ভুত সব রোগ দেখা দিচ্ছে। এমন এক ধরণের নিউমোনিয়া এবং বিরল চর্মরোগ (ক্যাপোসি সারকোমা) দেখা দিচ্ছিল যা সাধারণত দুর্বল বৃদ্ধ বা মুমূর্ষু রোগীদের হয়।
শুরুতে এই রোগটিকে ভুল করে কেবল সমকামীদের রোগ মনে করা হয়েছিল। কিন্তু দ্রুতই দেখা গেল এটি রক্ত গ্রহণকারী রোগী, মাদকাসক্ত এবং নারীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে বিজ্ঞানীরা (ফ্রান্সের লুক মন্টাগনিয়ার এবং আমেরিকার রবার্ট গ্যালো) অবশেষে সেই ভাইরাসটিকে খুঁজে পান, যার নাম দেওয়া হয় এইচআইভি (HIV)।
এই ভাইরাস এলো কোথা থেকে?
বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে এইচআইভি আসলে মানুষের ভাইরাস ছিল না। এটি এসেছে আমাদের নিকটাত্মীয় শিম্পাঞ্জিদের কাছ থেকে। শিম্পাঞ্জিদের শরীরে SIV (Simian Immunodeficiency Virus) নামক একটি ভাইরাস থাকে।
শিকারি বা কাট-হান্টার থিওরি-
ধারণা করা হয়, আফ্রিকার ক্যামেরুন অঞ্চলে শিকারিরা যখন শিম্পাঞ্জি শিকার করত, তখন কাটাকাটির সময় শিম্পাঞ্জির রক্ত শিকারির হাতের কোনো কাটা অংশ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করেছিল। একে বলা হয় ‘স্পিলওভার’ বা প্রজাতি থেকে প্রজাতিতে সংক্রমণ। ১৯০৮ সালের দিকে প্রথম এই সংক্রমণ ঘটে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন।
এরপর নদীপথে এটি কঙ্গোর কিনশাসা শহরে পৌঁছায়। সেখান থেকে ষাটের দশকে হাইতি এবং পরিশেষে ১৯৬৯ সালের দিকে আমেরিকায় প্রবেশ করে। দীর্ঘ সময় ধরে ভাইরাসটি মানুষের অগোচরে ছড়িয়ে পড়েছিল, কারণ এটি আক্রান্ত হওয়ার অনেক বছর পর লক্ষণ প্রকাশ পায়।
শেষ কথা
এইচআইভি-র ইতিহাস যেমন বেদনার, তেমনি এটি বিজ্ঞানের এক বিশাল সংগ্রামের গল্প। আজ আমরা জানি এই ভাইরাস কী এবং কীভাবে একে রুখে দেওয়া যায়। বর্তমানে অ্যান্টি-রেট্রোভাইরাল (ARV) ওষুধের মাধ্যমে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায় সুস্থ মানুষের মতোই দীর্ঘ জীবন পার করতে পারেন।
এর পরবর্তী পর্বে আমরা আলোচনা করব কীভাবে আধুনিক চিকিৎসা এই মরণব্যাধিকে জয় করছে এবং বিজ্ঞানীরা এর স্থায়ী নিরাময় বা ভ্যাকসিনের কতটা কাছাকাছি পৌঁছেছেন।









