ভারতে চলছে গণতন্ত্রের আড়ালে উগ্র হিন্দুত্ববাদের আগ্রাসনঃ মুসলিম প্রান্তিকীকরণ ও আসামের কামাখ্যা মেলার নির্মম বাস্তবচিত্র

আসামের কামাখ্যা মন্দিরের আম্বুবাচি মেলায় মুসলিম ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ ও হেনস্থার যে ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে, সেটি বর্তমান ভারতের সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং কাঠামোগত ইসলামোফোবিয়ার এক অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও জীবন্ত দলিল।
গণতন্ত্রের আড়ালে অর্থনৈতিক বর্ণবাদ
বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রছায়ায় উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শকে সাধারণ মানুষের মগজে এমনভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে (ব্রেইন ওয়াশ), যার ফলে এক বিশাল অংশের নাগরিক আজ চরমপন্থী মানসিকতা ধারণ করছে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ রূপটি দেখা যাচ্ছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে—যেখানে মুসলিমদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও জীবিকার অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদেরকে সমাজ থেকে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে।
আসামের কামাখ্যা মেলা হিন্দুত্ববাদী উগ্রতার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ
সম্প্রতি আসামের গুয়াহাটির ঐতিহ্যবাহী কামাখ্যা মন্দিরের ‘আম্বুবাচি মেলা’য় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা এই পরিকল্পিত বিদ্বেষের নির্মম উদাহরণ। প্রায় ৮ লাখ পুণ্যার্থীর উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে মুসলিম ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ধর্মীয় সামগ্রী বিক্রির অপরাধে (?) মেলা প্রাঙ্গণ থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়।
ভিডিওর দৃশ্য এবং কথোপকথন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একজন উগ্রপন্থী হিন্দু নারী অত্যন্ত আক্রমণাত্মকভাবে এক তরুণ মুসলিম বিক্রেতাকে জেরা করছেন। সেখানে স্পষ্ট শোনা যায়:
উগ্রপন্থী নারী: “কী বিক্রি করছিস? … তোর মুসলিম হয় না না হয়? (তুই মুসলিম কি না?)” তরুণ বিক্রেতা: (ভীতসন্ত্রস্ত কণ্ঠে নিজের ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত করে) উগ্রপন্থী নারী: “মুসলিম হয়ে সিন্দুর বিক্রি করতে আইছিস? … উঠ এখান থেকে, উঠ! আমাদের আসামে এগুলো চলবে না। ব্যবসা করতে হলে নিয়ম মেনে করতে হবে।”
ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে দেখলে দেখা যায়, এই মেলায় মুসলিমরা যুগের পর যুগ ধরে পুণ্যার্থীদের কাছে ফুল, মালা, সিন্দুর ও ধর্মীয় সামগ্রী বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কিন্তু উগ্রবাদের বিষবাষ্প আজ সেই সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ওই নারী এবং তার সহযোগীরা জোর করে তাদের দোকানপাট বন্ধ করে দিচ্ছে এবং জিনিসপত্র ব্যাগে পুরে চলে যেতে বাধ্য করছে। এমনকি এক মুসলিম ব্যবসায়ীকে নির্মমভাবে মারধর ও তার পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
অর্থনৈতিক বয়কট ও কাঠামোগত নিপীড়ন
এই ঘটনাটি ভারতের বর্তমান পরিস্থিতির একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। মুসলিমদের বিরুদ্ধে আজ এক ধরণের ‘অর্থনৈতিক বর্ণবাদ’ বা ইকোনমিক অ্যাপার্থাইড (Economic Apartheid) চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সরকারি চাকরিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব আগে থেকেই সংকুচিত, আর এখন ক্ষুদ্র ব্যবসা, ফুটপাতের দোকান, কিংবা ধর্মীয় উৎসবগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রুটি-রুজির পথও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে ভীতিজনক বিষয় হলো, এই চরমপন্থীরা আইন নিজের হাতে তুলে নিলেও প্রশাসন ও পুলিশ সম্পূর্ণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। রাষ্ট্র যখন অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে উল্টো তাদের পরোক্ষ সুবিধা (Facilitate) দেয়, তখন উগ্রবাদীরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
‘গদি মিডিয়া’ ও প্রাতিষ্ঠানিক পচন
এই পুরো বৈষম্যের প্রক্রিয়াটিকে আড়াল করছে এবং বৈধতা দিচ্ছে ভারতের মূলধারার কর্পোরেট সংবাদমাধ্যম, যা জনগণের কাছে ‘গদি মিডিয়া’ নামে পরিচিত। এই মিডিয়াগুলো প্রকৃত সমস্যা উধাও করে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা মুসলিম বিরোধী ন্যারেটিভ তৈরি করছে। এর ফলে সমাজের একটা বড় অংশ—তা সে শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত—মুসলিমদের ‘শত্রু’ হিসেবে গণ্য করতে শুরু করেছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যেও এই উগ্র মানসিকতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যার ফলে প্রতিটা সেক্টরে মুসলিমরা আজ অধিকারবঞ্চিত।
সমাজের মেরুকরণ
এটা সত্য যে, ভারতের সকল হিন্দু এই চরমপন্থা সমর্থন করেন না। এখনও একটি বিশাল অংশ ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবিকতায় বিশ্বাসী। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, অপর যে অংশটি উগ্র হিন্দুত্ববাদে দীক্ষিত হয়েছে, তারা অত্যন্ত সংগঠিত, হিংস্র এবং রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট। ফলে শান্তিকামী সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আজ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পায়, আর চরমপন্থীরা বাধাহীনভাবে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলেছে।
এটি একটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্যাটার্ন
কামাখ্যা মেলার এই ঘটনা কোনো নতুন বা আকস্মিক ঘটনা নয়। ভিডিওর তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০২২ সালে কর্ণাটকে মন্দিরের মেলাগুলোতে মুসলিম ব্যবসায়ীদের নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং ২০২৫ সালের ঐতিহাসিক মহাকুন্ত মেলাতেও একই ধরণের উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। ২০২৬ সালে এসে এই ধারা আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। ধর্মীয় উৎসবের পবিত্রতাকে আজ রাজনৈতিক ফায়দা এবং ঘৃণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
আসামের কামাখ্যা মেলায় অসহায় মুসলিম নারী ও যুবকদের উচ্ছেদের এই ঘটনা কেবল কিছু মানুষের জীবিকা হরণের গল্প নয়; এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক কাঠামোর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার শামিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং বিশ্বের সচেতন মহলের এখনই ভারতের এই কাঠামোগত মুসলিম নিধনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায়, এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক বয়কট অদূর ভবিষ্যতে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।






