পর্যায় সারণি কাকে বলে? পর্যায় সারণি মনে রাখার কৌশল?

পর্যায় সারণি হলো বিভিন্ন মৌলিক পদার্থকে একসাথে উপস্থাপনের একটি আন্তর্জাতিক ভাবে গৃহীত ছক। মূলত এটি একটি ছক বা টেবিল। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত মৌলসমূহকে তাদের ইলেকট্রন বিন্যাসের উপর ভিত্তি করে, ধর্মাবলী বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীতে ও পর্যায়ে বিভক্ত করে মৌলসমূহের পারমাণবিক সংখ্যার ক্রমানুসারে পর্যায় সারণিতে সাজানো হয়েছে। পর্যায় সারণিতে মোট ১১৮টি মৌল রয়েছে। এর মাঝে ২২টি ধাতু এবং ২০টি ধাতু রয়েছে।
চলুন তাহলে, পর্যায় সারণি কাকে বলে? পর্যায় সারণি মনে রাখার কৌশল, আধুনিক পর্যায় সারণি, পর্যায় সারণির বৈশিষ্ট্য, ধর্ম ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে জেনে নেই।
(১) পর্যায় সারণি কাকে বলে?

বিভিন্ন মৌলের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মের মধ্যে মিল, অমিল এবং এসকল ধর্মের ক্রম পরিবর্তন দেখানোর জন্য মৌলসমূহকে কতগুলো রো ও কলামে সাজিয়ে যে সারণি প্রস্তুত করা হয়েছে তাকে পর্যায় সারণি বলে।
আবার বলা যায় যে, বিভিন্ন মৌলের মধ্যে ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মের মিল বা অমিল এবং সে সকল ধর্মের মধ্যে পরিবর্তন দেখার জন্য যে সকল মৌলের সারণী সাজানো হয়, তাকে পর্যায় সারণি বলে।
(২) পর্যায় সারণির জনক কে?
পর্যায় সারণির জনক হলোঃ- বিজ্ঞানী মেন্ডেলিফ। তিনি পর্যায় সূত্র আবিষ্কার করেন।
(৩) পর্যায় সারণির বৈশিষ্ট্য
- পর্যায় সারণি কতগুলো আনুভূমিক সারি এবং খাড়া স্তম্ভে আছে। সারিগুলোকে “পর্যায়” এবং স্তম্ভ গুলোকে “গ্রুপ” বলা হয়।
- পর্যায় সারণিতে ৭টি পর্যায় এবং ১৮টি গ্রুপ বিদ্যমান।
- প্রতিটি পর্যায় বামদিকের গ্রুপ থেকে আরম্ভ করে ডানদিকে গ্রুপ-১৮ পর্যন্ত বিস্তৃত।
- প্রথম পর্যায় মাত্র দুইটি মৌল বিদ্যমান। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায় ৮টি করে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম পর্যায় ১৮টি করে মৌল আছে। ৬ষ্ঠ পর্যায়ে আছে ৩২টি। সপ্তম পর্যায়েও ৩২ টি মৌল রয়েছে।
- গ্রুপ-২ এবং গ্রুপ-৩ এর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থানকারী মৌলগুলোকে “অবস্থান্তর মৌল” বলা হয়।
- পর্যায়ভিত্তিক মৌল সংখ্যা-
- পর্যায় ১ এ শুধু ২টি মৌল রয়েছে।
- পর্যায় ২ এবং পর্যায় ৩ এ ৮টি করে মৌল রয়েছে।
- পর্যায় ৪ এবং পর্যায় ৫ এ ১৮টি করে মৌল রয়েছে।
- পর্যায় ৬ এবং পর্যায় ৭ এ ৩২টি করে মৌল রয়েছে।
- গ্রুপভিত্তিক মৌল সংখ্যা-
- গ্রুপ ১ এ ৭টি মৌল রয়েছে।
- গ্রুপ ২ এ ৬টি মৌল রয়েছে।
- গ্রুপ ৩ এ ৩২টি মৌল রয়েছে।
- গ্রুপ ৪ থেকে গ্রুপ ১২ পর্যন্ত প্রত্যেকটি গ্রুপে ৪টি করে মৌল রয়েছে।
- গ্রুপ ১৩ থেকে গ্রুপ ১৭ পর্যন্ত প্রত্যেকটিতে ৬টি করে মৌল রয়েছে।
- গ্রুপ ১৮ এ ৭টি মৌল রয়েছে।
- একই পর্যায়ের বাম থেকে ডানের দিকে গেলে মৌলসমূহের ধর্ম ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়৷
- একই গ্রুপের মৌলগুলোর ভৌত এবং রাসায়নিক ধর্ম প্রায় একই রকমের হয়।
যদি মৌলগুলাের ধর্মের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হয় তাহলে নিচের বৈশিষ্ট্যগুলাে লক্ষ করা যায়-
- একই পর্যায়ের বাম থেকে ডানের দিকে গেলে মৌলসমূহের ধর্ম ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়।
- একই গ্রুপের মৌলগুলাের ভৌত এবং রাসায়নিক ধর্ম প্রায় একই রকমের হয়।
এগুলো ছাড়াও পর্যায় সারণির আরও অনেক বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
(৩) আধুনিক পর্যায় সারণি
আধুনিক পর্যায় সারণিতে ১১৮ টি মৌল রয়েছে।
নিম্নে আধুনিক পর্যায় সারণির সূত্রটি দেয়া হল-
আধুনিক পর্যায় সারণির সূত্রঃ
মৌলিক পদার্থ ও তাদের সৃষ্ট যৌগিক পদার্থ সমূহের মধ্যে ভৌত রাসায়নিক মৌল সমূহের পারমাণবিক সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়।
আধুনিক পর্যায় সারণি মনে রাখার জন্য আধুনিক পর্যায় সারণির মৌলগুলোকে অনুভূমিক শাড়ি বা পর্যায়ে এবং আর্থিকভাবে সাজানো হয়েছে। আর এই পর্যায়ে সমূহকে 1 থেকে 7 সংখ্যার সাহায্যে শ্রেণির মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে।
আধুনিক পর্যায় সারণির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্রথম পর্যায় ব্যতীত অন্যান্য সকল পর্যায়ে বাম দিক থেকে একটি ক্ষার ধাতু দিয়ে শুরু হবে এবং ডান দিক থেকে অর্থাৎ সর্বশেষে একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস ধারা শেষ হবে।
(৪) পর্যায় সারণি মনে রাখার কৌশল?
বর্তমান পর্যায় সারণিতে মোট ১১৮টি মৌলের নাম লেখা আছে। এতগুলো মৌলের নাম মনে রাখা অনেক কঠিন। কিন্তু পরীক্ষা বা অন্য যেকোন কাজে এগুলো আমাদের জন্য প্রয়োজন। পর্যায় সারণির মৌলগুলোর নাম ও পর্যায় সারণিতে এদের স্থান মনে রাখা খুব জরুরি। তবে কিছু কিছু পর্যায় সারণি মনে রাখার কৌশল আছে যার মাধ্যমে আমরা সহজেই মৌলগুলোর নাম মনে রাখতে পারি। এর মাঝে একটি উপায় হলো ছন্দের মাধ্যমে / কবিতার মাধ্যমে বা গানের মাধ্যমে মৌলগুলোর নাম মনে রাখা।
নিম্নে পর্যায় সারণি মনে রাখার কৌশল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
গ্রুপ 1 (IA) – ক্ষার ধাতু (Alkali metals)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ হাই, লিনাকে রুবি ছেঁচে ফেলেছে।
H – হাইড্রোজেন
Li – লিথিয়াম
Na – সোডিয়াম
K – পটাশিয়াম
Rb – রুবিডিয়াম
Cs – সিজিয়াম
Fr – ফ্রানসিয়াম
গ্রুপ 2 (IIA) – ক্ষারীয় আর্থ ধাতু (Alkaline earth metals)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ বিরিয়ানি, মোগলাই, কাবাব সরিয়ে বাটিতে রাখো।
Be – বেরিলিয়াম
Mg – ম্যাগনেসিয়াম
Ca – ক্যালসিয়াম
Sr – স্ট্রোনসিয়াম
Ba – বেরিয়াম
Ra – রেডিয়াম
গ্রুপ 3 (IIIB) – স্ক্যান্ডিয়াম গ্রুপ (Scandium group)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ স্কাই টালা।
Sc – স্ক্যান্ডিয়াম
Y – ইট্রিয়াম
Lanthanide সিরিজ শুরু – La – ল্যান্থানাম
Actinide সিরিজ শুরু – Ac – অ্যাক্টিনিয়াম
গ্রুপ 4 (IVB) – টাইটানিয়াম গ্রুপ (Titanium group)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ টাই জাহারা।
Ti – টাইটানিয়াম
Zr – জিরকোনিয়াম
Hf – হাফনিয়াম
Rf – রাদারফোর্ডিয়াম
গ্রুপ 5 (VB) – ভ্যানাডিয়াম গ্রুপ (Vanadium group)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ ভাল নাচতে তাই দৌড়াও।
V – ভ্যানাডিয়াম
Nb – নিওবিয়াম
Ta – ট্যানটালাম
Db – ডাবনিয়াম
গ্রুপ 6 (VIB) – ক্রোমিয়াম গ্রুপ (Chromium group)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ ক্রিকেট মজা সবসময়।
Cr – ক্রোমিয়াম
Mo – মলিবডেনাম
W – টাংস্টেন
Sg – সিবোর্গিয়াম
গ্রুপ 7 (VIIB) – ম্যাঙ্গানিজ গ্রুপ (Manganese group)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ মিষ্টি তরকারি রান্না।
Mn – ম্যাঙ্গানিজ
Tc – টেকনেশিয়াম
Re – রেনিয়াম
Bh – বোহরিয়াম
গ্রুপ 8 (VIIIB) – লোহা গ্রুপ (Iron group)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ লোহা রুথে অসমিহা।
Fe – লোহা
Ru – রুথেনিয়াম
Os – অসমিয়াম
Hs – হাসিয়াম
গ্রুপ 9 (VIIIB) – কোবাল্ট গ্রুপ (Cobalt group)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ কোবারো ইমি।
Co – কোবাল্ট
Rh – রোডিয়াম
Ir – ইরিডিয়াম
Mt – মাইটনারিয়াম
গ্রুপ 10 (VIIIB) – নিকেল গ্রুপ (Nickel group)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ নিপা প্লাদা।
Ni – নিকেল
Pd – প্যালাডিয়াম
Pt – প্লাটিনাম
Ds – ডার্মস্টাটিয়াম
গ্রুপ 11 (IB) – তামা গ্রুপ (Coinage metals)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ তা রুপ সো রেন্ট।
Cu – তামা
Ag – রূপা
Au – সোনা
Rg – রেন্টজেনিয়াম
গ্রুপ 12 (IIB) – দস্তা গ্রুপ (Zinc group)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ দসক্যা পাক।
Zn – দস্তা
Cd – ক্যাডমিয়াম
Hg – পারদ
Cn – কপের্নিসিয়াম
গ্রুপ 13 (IIIA) – বোরন গ্রুপ (Boron group)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ বোয়াল গেলো ইন্ডিয়া তেও যাই।
B – বোরন
Al – অ্যালুমিনিয়াম
Ga – গ্যালিয়াম
In – ইন্ডিয়াম
Tl – থ্যালিয়াম
গ্রুপ 14 (IVA) – কার্বন গ্রুপ (Carbon group)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ কাল সিলেট গেলে স্বর্ণ পাবো।
C – কার্বন
Si – সিলিকন
Ge – জার্মেনিয়াম
Sn – টিন
Pb – সিসা
Fl – ফ্লেরোভিয়াম
গ্রুপ 15 (VA) – নাইট্রোজেন গ্রুপ (Nitrogen group)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ নানা পটেকার আসলো সব বিলিয়ে মিষ্টি।
N – নাইট্রোজেন
P – ফসফরাস
As – আর্সেনিক
Sb – অ্যান্টিমনি
Bi – বিসমাথ
Mc – মস্কোভিয়াম
গ্রুপ 16 (VIA) – চ্যালকোজেন (Chalcogens)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ ও এসএসসি তে পড়ে লাভ।
O – অক্সিজেন
S – সালফার
Se – সেলেনিয়াম
Te – টেলুরিয়াম
Po – পোলোনিয়াম
Lv – লিভারমোরিয়াম
গ্রুপ 17 (VIIA) – হ্যালোজেন (Halogens)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ ফকিরা কালু বরিশাল থেকে ইস্টিমারে আসতেছে তবুও।
F – ফ্লোরিন
Cl – ক্লোরিন
Br – ব্রোমিন
I – আয়োডিন
At – অ্যাস্টাটিন
Ts – টেনেসিন
গ্রুপ 18 (VIIIA) – নিষ্ক্রিয় গ্যাস (Noble gases)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ হিলি নিয়ন্তা আর কিশোর যাবে রংপুর ওগো।
He – হিলিয়াম
Ne – নিয়ন
Ar – আর্গন
Kr – ক্রিপ্টন
Xe – জেনন
Rn – রেডন
Og – ওগানেসন
ল্যান্থানাইড সিরিজ (57–71)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ লাল ছেলে প্রনব নাচে, পরে সাজে ইউরোপের গড, টার্বো ডিজেল হলে এর থালা ইউ লুটে।
La – ল্যান্থানাম
Ce – সেরিয়াম
Pr – প্রাসিওডিমিয়াম
Nd – নিওডিমিয়াম
Pm – প্রোমেথিয়াম
Sm – সামারিয়াম
Eu – ইউরোপিয়াম
Gd – গ্যাডোলিনিয়াম
Tb – টার্বিয়াম
Dy – ডিসপ্রোসিয়াম
Ho – হলমিয়াম
Er – এর্বিয়াম
Tm – থুলিয়াম
Yb – ইটার্বিয়াম
Lu – লুটেটিয়াম
অ্যাক্টিনাইড সিরিজ (89–103)
মনে রাখার কৌশল/ছন্দঃ আক্কেল থোরু প্রটেক্ট নন্দন, পায় অ্যামারিকান কিউরিয়াম, বার্কলি ক্যালিফোর্নিয়ান আইন সি নোবেল।
Ac – অ্যাক্টিনিয়াম
Th – থোরিয়াম
Pa – প্রোট্যাক্টিনিয়াম
U – ইউরেনিয়াম
Np – নেপটুনিয়াম
Pu – প্লুটোনিয়াম
Am – অ্যামেরিসিয়াম
Cm – কিউরিয়াম
Bk – বার্কেলিয়াম
Cf – ক্যালিফোর্নিয়াম
Es – আইনস্টাইনিয়াম
Fm – ফার্মিয়াম
Md – মেন্ডেলেভিয়াম
No – নোবেলিয়াম
Lr – লরেনসিয়াম
এভাবে খুব সহজেই পর্যায় সারণি মনে রাখার কৌশল ব্যবহার করে বিভিন্ন ছন্দ/কবিতা/গানের সাথে পড়লে মৌলগুলোর নাম এবং কোন পর্যায়ের কোন গ্রুপে আছে তা জেনে সহজেই বলা সম্ভব। শুধু যে এ ছন্দগুলোই ব্যবহার করতে হবে এমন না। আপনি চায়লে আপনার নিজের সুবিধামত বিভিন্ন ছন্দ ব্যবহার করে সহজেই মনে রাখতে পারবেন।









