আধুনিক শ্রী পদ্ধতিতে ধান চাষ

শ্রী পদ্ধতিতে (System of Rice Intensification বা SRI) ধান চাষ হলো ধান উৎপাদনের একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত নিবিড় প্রথা। এই পদ্ধতিতে চাষ করলে কম খরচে এবং কম জল ব্যবহার করে চিরাচরিত পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব। নিচে এই পদ্ধতির বিস্তারিত বিবরণ আলোচনা করা হলো-
(১) শ্রী পদ্ধতি ও এর সুবিধাসমূহ
শ্রী পদ্ধতি হলো ধান চাষের এমন এক উন্নত মাধ্যম যার মূল লক্ষ্য হলো নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে ধানের ফলন বৃদ্ধি করা । এই পদ্ধতিতে চাষ করার প্রধান সুবিধাসমূহ হলো-
- বীজের সাশ্রয়: প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় অনেক কম পরিমাণ বীজের প্রয়োজন হয় ।
- জল সাশ্রয়: প্রচলিত প্রথার তুলনায় প্রায় অর্ধেক পরিমাণ জলে এই চাষ সম্ভব ।
- খরচ হ্রাস: চাষের সার্বিক খরচ কমে এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রয়োজনীয়তাও তুলনামূলক কম থাকে ।
- উৎপাদন বৃদ্ধি: এই পদ্ধতিতে ধান চাষ করলে উৎপাদন ১০% থেকে ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে ।
- সময় সাশ্রয়: ফসল উৎপাদনের সময়সীমা প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে ৭ থেকে ১০ দিন কমিয়ে আনে ।
(২) বীজ বাছাই ও শোধন প্রক্রিয়া


সুস্থ ও সবল চারা পাওয়ার জন্য সঠিক উপায়ে বীজ বাছাই ও শোধন অত্যন্ত জরুরি।
- বীজ বাছাই: ১ বিঘা জমির জন্য ১ কেজি বীজ ধান পরিষ্কার করে ২ দিন রোদে শুকিয়ে নিতে হবে । এরপর ১ লিটার জলে ১৫০-১৬৫ গ্রাম লবণ মিশিয়ে একটি দ্রবণ তৈরি করতে হবে যাতে একটি আস্ত ডিম ভেসে থাকে। এই দ্রবণে বীজ ঢেলে ৫-৬ মিনিট নাড়লে দেখা যাবে পুষ্ট বীজ নিচে থিতিয়ে পড়েছে এবং দুর্বল বীজগুলো উপরে ভাসছে। ভাসমান বীজ সরিয়ে ফেলে নিচের পুষ্ট বীজগুলো পরিষ্কার জলে ৪-৫ বার ধুয়ে নিতে হবে যাতে কোনো লবণ লেগে না থাকে ।
- বীজ শোধন: ১ কেজি বীজ ২ লিটার জলে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। এরপর প্রতি কেজি বীজের জন্য ২-৩ গ্রাম কার্বেনন্ডাজিম অথবা ৪-৫ গ্রাম ট্রাইকোডারমা ভিরিডি বা গোমূত্র দ্রবণ মিশিয়ে শোধন করতে হবে। সবশেষে ২৪-৪৮ ঘণ্টার জন্য জাঁকে দিয়ে বীজ অঙ্কুরিত করতে হবে ।
(৩) বীজতলা ও মূল জমি তৈরি


- বীজতলা: ১ কেজি বীজের জন্য ৩ হাত চওড়া ও ১৬ হাত লম্বা একটি বেড (বা সমপরিমাণ দুটি বেড) তৈরি করতে হবে। বেডের চারধারে ১ ফুট চওড়া ড্রেন রাখতে হবে এবং উপরিভাগ সমতল করতে হবে। কাদা করার সময় ১৩০-১৫০ কেজি খামারজাত সার, ৭-৮ কেজি কেঁচো সার, ৩৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ৪০০-৫০০ গ্রাম সিঙ্গেল সুপার ফসফেট এবং ২০০ গ্রাম মিউরেট অব পটাশ মেশাতে হবে ।
- মূল জমি: বীজ বোনার আগে থেকেই জমি তৈরির কাজ শুরু করতে হবে। ৭ দিন অন্তর ৩টি চাষ দিলে আগাছা কম হয়। শেষ চাষের আগে বিঘা প্রতি ৩-৪ টন খামারজাত সার এবং ১ টন কেঁচো সার দেওয়া উত্তম। প্রাথমিক সার হিসেবে ১০ কেজি ডিএপি, ২-৩ কেজি ইউরিয়া এবং ৫-৬ কেজি মিউরেট অফ পটাশ দিতে হবে। এছাড়া প্রতি নয় লাইন (২ মিটার) অন্তর ১ ফুটের নালা কাটতে হবে।
(৪) চারা রোপণ ও পরিচর্যা


- রোপণ পদ্ধতি: চারার বয়স ৮-১২ দিন হলে মাটিসহ তুলে নিতে হবে। মূল জমিতে ১০ ইঞ্চি অন্তর সারিতে এবং প্রতি সারিতে ১০ ইঞ্চি দূরত্বে মাত্র ১টি করে চারা রোপণ করতে হবে। চারাগুলো মাটির মাত্র ১ ইঞ্চি গভীরতায় আলতো করে বসাতে হবে।
- পরিচর্যা ও নিড়ান: ধান চাষে নিড়ানের জন্য ‘উইডার’ মেশিন ব্যবহার করা কার্যকর।
- প্রথম নিড়ান: ১২-১৫ দিনের মাথায় ৫-৬ কেজি ইউরিয়া ছড়িয়ে উইডার চালাতে হবে।
- দ্বিতীয় নিড়ান: ২২-২৫ দিনের মাথায় উইডার চালাতে হবে।
- তৃতীয় নিড়ান: ৩৫-৪০ দিনের মাথায় ৫-৬ কেজি ইউরিয়া ও ৫-৬ কেজি মিউরেট অফ পটাশ দিয়ে নিড়ান দিতে হবে।
(৫) ধান চাষে প্রচলিত পদ্ধতি বনাম শ্রী পদ্ধতির পার্থক্য
| বিষয় | চিরাচরিত পদ্ধতি | শ্রী পদ্ধতি |
| বীজের হার | বিঘা প্রতি ১০-১২ কেজি | বিঘা প্রতি মাত্র ১ কেজি |
| চারার বয়স | ৩০-৪৫ দিন | ৮-১২ দিন |
| রোপণ দূরত্ব | অনির্দিষ্ট | ১০ ইঞ্চি |
| চারার সংখ্যা | প্রতি গুছিতে ৪-৮টি | প্রতি গুছিতে ১টি সুস্থ চারা |
| পাশকাঠী | গুছি প্রতি ৮-১২টি | গুছি প্রতি কমপক্ষে ৪০টি |
| ফলন্ত শীষ | গুছি প্রতি ৭-৮টি | গুছি প্রতি ৩০-৩৫টি |
| সেচ সহনশীলতা | সেচের অভাবে ফলন কমে | খরা বা জলের অভাব সহ্য করতে পারে |
[তথ্যসূত্র: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষি বিভাগের সৌজন্যে এবং নবদিশা ও AHEAD Initiatives-এর উদ্যোগে কৃষকদের কল্যাণে প্রচার করা হয়েছে।]









