ভারতের বহুত্ববাদী সমাজ আজ উগ্র হিন্দুত্ববাদ, মুসলিম বিদ্বেষী মিথ্যা প্রোপাগান্ডা এবং বিভাজনের সমাজে পরিণত

কলকাতা – বিখ্যাত সাংবাদিক আরফা খানম শেরওয়ানির একটি সাম্প্রতিক বক্তব্য ভারতের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এক নির্মম দলিল হিসেবে সামনে এসেছে। তিনি বলেছেন, “মোদী-র ভারতে একজন মুসলিম হওয়ার মানে হলো প্রতিদিনের অপমান, প্রতিদিনের হুমকি, প্রতিদিনের ভোগান্তি – এমন এক বাস্তবতা যা নিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাঁচতে বাধ্য।” এই একটি বাক্য কেবল কোনো একক ব্যক্তির ক্ষোভ নয়, বরং এটি সমকালীন ভারতের মূলধারার ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ক্রমাগত ক্ষয় এবং একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রান্তিককরণের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। ২০১৪ সালের পরবর্তী অধ্যায়ে ভারতকে যেভাবে একটি বহুত্ববাদী ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে ক্রমান্বয়ে উগ্র মেজরিটারিয়ান বা সংখ্যাগুরুবাদী কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তার নেপথ্যে রয়েছে এক সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রকৌশল।
মগজ ধোলাইয়ের সূক্ষ্ম জাল এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর
উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য এটি নয় যে তারা নির্বাচনে জিতছে, বরং তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তারা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের চিন্তাচেतना ও মগজ ধোলাই করতে সক্ষম হয়েছে। এই মগজ ধোলাই কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া অলৌকিক ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের প্রাতিষ্ঠানিক পরিশ্রম। সমাজের প্রতিটি স্তরে—স্কুলের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে পাড়ার সাংস্কৃতিক ক্লাব, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে শুরু করে মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেল—সব জায়গায় একটি নির্দিষ্ট আখ্যান বা ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ, অরাজনৈতিক মানুষকেও বোঝানো হয়েছে যে তাদের ধর্মীয় অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে এবং এই সংকটের মূল কারণ হলো দেশের অভ্যন্তরে থাকা সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী।
এই প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচারের চারের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি সমাজ থেকে शिक्षित ও অশিক্ষিতের মধ্যকার নৈতিক পার্থক্যকে মুছে দিয়েছে। অতীতে মনে করা হতো শিক্ষা মানুষকে সহনশীল ও যুক্তিবাদী করে তোলে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী ব্যক্তিটিও অত্যন্ত উগ্র ও বিদ্বেষমূলক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ঘৃণার চাষ হচ্ছে, তার বড় অংশজুড়ে রয়েছেন শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা। এর কারণ, উগ্র মতাদর্শকে সুকৌশলে ‘জাতীয়তাবাদ’ এবং ‘ঐতিহাসিক গৌরব পুনরুদ্ধারের’ মোড়কে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ফলে, একজন সাধারণ মানুষ যখন মুসলিমবিদ্বেষী চিন্তা লালন করেন, তখন তিনি ভাবেন তিনি আসলে নিজের দেশের এবং ধর্মের সেবা করছেন। এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরই উগ্র হিন্দুত্ববাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
অপপ্রচারের অস্ত্রাগাররে “জিহাদ” তত্ত্বের কারখানাজাত উৎপাদন
যুগ যুগ ধরে ভারতের হিন্দু-মুসলিম সমাজ যে পারস্পরিক মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে বেঁচে ছিল, তাকে ভেঙে ফেলার জন্য প্রতিদিন নতুন নতুন পরিভাষা ও অপপ্রচার তৈরি করা হচ্ছে। তথাকথিত ‘গদি মিডিয়া’ বা কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত মূলধারার গণমাধ্যমগুলো এই অপপ্রচারের মূল কারিগর হিসেবে কাজ করছে। প্রতিদিন প্রাইম টাইম টকশোতে এমন সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয় যা সমাজকে আরও বেশি মেরুকৃত করে। ‘মুসলিম মানে সন্ত্রাসী’ ‘লাভ জিহাদ’, ‘ল্যান্ড জিহাদ’, ‘থুতু জিহাদ’ বা ‘ভোট জিহাদ’-এর মতো কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন তত্ত্বগুলো অবিরত প্রচারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে একটি স্থায়ী ভীতি তৈরি করা হয়েছে।
এই পরিভাষাগুলো কোনো সাধারণ রসিকতা বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো এক একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র। উদাহরণস্বরূপ, যখন ‘লাভ জিহাদ’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হয়, তখন প্রতিটি হিন্দু পরিবারকে তাদের মেয়েদের সুরক্ষার নামে এক প্রকার প্যারানোয়া বা অমূলক আশঙ্কার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়। যখন ‘থুতু জিহাদ’ বা অন্য কোনো অদ্ভুত তত্ত্ব ছড়ানো হয়, তখন মুসলিমদের দ্বারা উৎপাদিত বা স্পর্শ করা খাবার ও সামগ্রীর প্রতি এক ধরনের শারীরিক ও মানসিক ঘৃণার জন্ম দেওয়া হয়। এর কারণ একটাই—অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে মুসলিমদের সম্পূর্ণ বয়কট করা। এই ক্রমাগত মিথ্যাচারের ফলে একজন সাধারণ হিন্দু নাগরিক, যিনি হয়তো কোনোদিন কোনো মুসলিমের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হননি, তিনিও তার অবচেতন মনে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে প্রতিটি মুসলিমই কোনো না কোনো ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত।
১০০ কোটি বনাম ২০ কোটি: প্রতিদিনের সামাজিক দূরত্বের বাস্তবতা
ভারতের জনসংখ্যার সমীকরণটি বিশাল—প্রায় ১০০ কোটি হিন্দু এবং প্রায় ২০ কোটি মুসলিম। এই দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে সামাজিক চুক্তি ও সৌহার্দ্য ছিল, তা আজ গুরুতর সংকটের মুখোমুখি। উগ্র রাজনীতির বিষবাষ্প এখন আর শুধু জনসভায় সীমাবদ্ধ নেই; তা প্রবেশ করেছে সরকারি ও বেসরকারি অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি গ্রামের চায়ের দোকান ও শহরের বহুতল আবাসনেও।
গুজরাটের মোডাসার হাসপাতালের ঘটনাটি এর একটি বাস্তব ও জলজ্যান্ত উদাহরণ। যেখানে একজন সাধারণ রোগীকে বা তার পরিজনকে কেবল তার নাম ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে প্রকাশ্যে ‘সন্ত্রাসী’ বলে সম্বোধন করা হয়, এবং তার চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো, হাসপাতালের সর্বোচ্চ authority সেই অভিযোগকে পাত্তাই দেয় না, উল্টো ঔদ্ধত্য দেখায়।
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ঘৃণা এখন আর কোনো গোপন অপরাধ নয়, এটি এখন এক ধরণের সামাজিক লাইসেন্স বা সামাজিক স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। অফিসে सहকর্মীদের মধ্যকার হালকা আড্ডায়, ট্রেনের কামরায় অচেনা মানুষের কথোপকথনে বা আবাসনের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মুসলিমদের নিয়ে কটু মন্তব্য করা বা তাদেরকে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দেখা এখন একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। ২০ কোটি মানুষকে সার্বক্ষণিকভাবে সন্দেহের তালিকায় রেখে, তাদেরকে অপরাধী বা সন্ত্রাসী হিসেবে গণ্য করে একটি রাষ্ট্র কখনো সুস্থভাবে এগিয়ে যেতে পারে না। এর ফলস্বরূপ, ভারতের ঐতিহ্যবাহী ‘গঙ্গা-যমুনি তহজিব’ বা যৌথ সংস্কৃতির যে গৌরব ছিল, তা আজ খণ্ডিত।
গুজরাটের মোডাসার হাসপাতালের সেই ঘটনার বিবরণ
গুজরাটের মোডাসার ড. বিনয় গান্ধী হাসপাতালে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অন্যায় নয়, বরং এটি আমাদের সমাজতত্ত্বের গভীরে গেঁথে বসা বিষাক্ত মনস্তত্ত্বের এক নগ্ন প্রতিফলন। রুটিনমাফিক চিকিৎসার প্রয়োজনে কিছু কাগজপত্রের কাজে হাসপাতালের মেডিকেল স্টোরে গিয়েছিলেন সুথার মইন নামের এক তরুণ এবং তাঁর পরিবার। সাধারণ এক পরিদর্শনে গিয়ে তাঁদের যে এমন এক চরম অসম্মানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা হয়তো তাঁদের ভাবনার অতীত ছিল। কাউন্টারে থাকা একজন কর্মচারী যখন মইনের কাগজপত্রে তাঁর নামটির দিকে তাকালেন, তখন তাঁর ভেতরের পুষে রাখা পূর্বধরণা ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ্য রূপ নিল। পুরো ফার্মেসির সামনে সবার উদ্দেশ্যে তিনি উচ্চস্বরে চিৎকার করে মন্তব্য করে বসলেন, “সন্ত্রাসীরা চলে এসেছে।”
একটি সাধারণ এবং পবিত্র নাম দেখে একজন রোগীকে বা সাধারণ নাগরিককে এভাবে জনসমক্ষে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দেওয়া যে কতটা অপমানজনক এবং মানসিক যন্ত্রণার, তা কেবল ভুক্তভোগী পরিবারটিই উপলব্ধি করতে পারে। এই চরম অপমানের প্রতিকার ও আইনি জবাবদিহিতা চাইতে মইন যখন হাসপাতালের প্রধান ড. বিনয় গান্ধীর দ্বারস্থ হন, তখন ন্যূনতম আশা ছিল প্রতিষ্ঠানটি হয়তো দুঃখ প্রকাশ করবে এবং ওই কর্মচারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু ভেতরের বাস্তব চিত্র ছিল আরও ভয়াবহ ও হতাশাজনক।
অভিযোগটিকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়ার পরিবর্তে ড. বিনয় গান্ধী অত্যন্ত অবজ্ঞার সাথে তা উড়িয়ে দেন। তিনি ঔদ্ধত্যের সাথে বলেন, “যাকে খুশি ডাকো, এমনকি মিডিয়াকেও জানাতে পারো; এতে আমার কোনো সমস্যা নেই।” একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সংবেদনহীন আচরণ প্রমাণ করে যে, সমাজে এই ধরণের ঘৃণামূলক মানসিকতা কেবল সাধারণ বা অশিক্ষিত স্তরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং উচ্চশিক্ষিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রধানদের মগজেও তা এক স্বাভাবিক অধিকার হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। যেখানে প্রকাশ্য অন্যায় বা বৈষম্য করার পরও অপরাধবোধ কিংবা আইনি জবাবদিহিতার বিন্দুমাত্র ভয় কাজ করে না।
আত্মোপলব্ধির প্রয়োজনীয়তা
উগ্র হিন্দুত্ববাদের এই বিস্তার কেবল ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের জন্যই ক্ষতিকর নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদে ভারতের ১০০ কোটি হিন্দুর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্বের জন্যও এক বড় হুমকি। কারণ, ঘৃণা কখনো একমুখী হয় না। যে সমাজ অন্য একটি বৃহৎ সম্প্রদায়কে ঘৃণা করতে করতে বড় হয়, সেই সমাজের নিজস্ব মানবিক মূল্যবোধ, দয়া, এবং আইন ও বিচারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ভারতের সংবিধানের যে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক মূল ভিত্তি, তাকে রক্ষা করতে হলে দেশের সাধারণ মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার স্বার্থে বিভাজন তৈরি করবেই, কিন্তু সমাজকে সেই বিভাজনের ফাঁদ থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব নাগরিকদেরই নিতে হবে। যতক্ষণ না সাধারণ মানুষ এই সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা ও মগজ ধোলাইয়ের কৌশলকে চিনতে পারবে এবং এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ভারতের বহুত্ববাদী আত্মার এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে থাকবে।

