ডিজিটাল আসক্তির জাঁতাকলে বিশ্ব, বিপর্যস্ত হরমোনাল ভারসাম্য

আধুনিক বিশ্ব প্রযুক্তির মায়াজালে আচ্ছন্ন। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল ডিভাইসের অপ্রতিরোধ্য টানে মানুষ যেন ভার্চুয়াল জগতের দাস হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তি বিশ্বকে যতটা ছোট করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি হুমকির মুখে ফেলেছে মানুষের জীবন, পরিবার, সমাজ এবং জাতিকে। সকাল থেকে রাত, এমনকি রাত থেকে ভোর পর্যন্ত ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্তি এখন মহামারির চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, যা ধীরে ধীরে মানুষের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক জীবনকে গ্রাস করছে।
(১) ডিজিটাল আসক্তির ভয়ংকর পরিণতি
এই আসক্তির ভয়াবহতা আমরা বারবার প্রত্যক্ষ করেছি। মনে পড়ে ঐশীর কথা, যে মোবাইল ফোনের আসক্তির কারণে মাদকাসক্ত হয়ে নিজের জন্মদাতা পুলিশ অফিসার বাবা ও মাকে নৃশংসভাবে খুন করেছিল। গত ২২ মার্চ চুয়াডাঙ্গায় আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। ছেলে রিফাত তার বাবার হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদে নামাজরত বাবাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। এমন ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজ ও জাতির জন্য গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। এই ডিজিটাল আসক্তি যুব সমাজকে এমনভাবে গ্রাস করছে যে, তারা লেখাপড়া, খাওয়া-দাওয়া, এমনকি ঘুমের মতো মৌলিক চাহিদাগুলোও ভুলে যাচ্ছে।
(২) গবেষণার তথ্য কী বলছে?
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী ইন্টারনেট আসক্তির কারণে মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এদের মধ্যে ২৬.১ শতাংশ মানসিক সমস্যার জন্য পুরোপুরি ইন্টারনেটকে দায়ী করেন, এবং ৫৯.৮ শতাংশ মোটামুটি দায়ী মনে করেন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ফলে মাত্র ১৩ বছর বয়সেই শিশু ও কিশোররা অনিদ্রা, বিষণ্নতা, উচ্চ রক্তচাপ, এমনকি ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এই আসক্তি তাদের দিন-রাতের পার্থক্য মুছে দিয়েছে, যা একটি ভয়ংকর নেশায় রূপান্তরিত হয়েছে।
ক) সামাজিক ও অপরাধমূলক প্রভাব
ডিজিটাল আসক্তি শুধু শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিই করছে না, সমাজে অপরাধের মাত্রাও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অ্যাডভেঞ্চার বা ফাইটিং সম্পর্কিত কন্টেন্ট দেখে অনেকে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছে, অভিভাবকদের না জানিয়ে বিপজ্জনক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট বা ধর্ষণের মতো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে, আবার কেউ চুরি, ডাকাতি বা হিংসাত্মক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছে। এই কন্টেন্টগুলো তরুণ মনকে উত্তেজিত করে, তাদেরকে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। ফলে সমাজে অপরাধের হার ক্রমশ বেড়ে চলেছে, যা জাতির ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছে।
খ) হরমোনাল ভারসাম্যে প্রভাব
চিকিৎসকদের মতে, ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার শরীরের হরমোনাল সাইকেল নষ্ট করে দেয়। আমাদের শরীর দিনে কাজ করার এবং রাতে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তৈরি। কিন্তু রাতভর ফোন বা ডিভাইস ব্যবহার এই প্রাকৃতিক ছন্দ ভেঙে দেয়। এর ফলে মেলাটোনিনের মতো হরমোনের উৎপাদন ব্যাহত হয়, যা ঘুম নিয়ন্ত্রণ করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ক্লান্তি, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা আসক্তিকে আরও গভীর করে। এই হরমোনাল ভারসাম্যহীনতা শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যই নয়, মানসিক স্থিতিশীলতাকেও বিপন্ন করে।
গ) সমাজ ও জাতির জন্য হুমকি
এই ভার্চুয়াল আসক্তি মানুষকে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় কমে যাচ্ছে, বন্ধন দুর্বল হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম স্ক্রল করতে করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করছে, যা তাদের সৃজনশীলতা, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই আসক্তি শুধু ব্যক্তিগত জীবনই নয়, সমগ্র সমাজ ও জাতির অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি জাতি যদি তার তরুণ প্রজন্মকে হারায়, তবে তার ভবিষ্যৎ কী হবে?
(৩) কী করা উচিত?
এই নীরব বিষ থেকে মুক্তি পেতে হলে সচেতনতা এবং সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের উপর নজর রাখা এবং সময়সীমা নির্ধারণ করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল আসক্তি সম্পর্কে সচেতনতামূলক কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এবং ক্ষতিকর কন্টেন্ট ফিল্টারিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এছাড়া, ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের সবাইকে প্রযুক্তির ব্যবহারে সংযমী হতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো, শারীরিক কসরত, এবং পরিবারের সঙ্গে মানসম্পন্ন সময় ব্যয় করা এই আসক্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
প্রযুক্তি মানব কল্যাণের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু এর অপব্যবহার আমাদের জীবনকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতের এই অতিরিক্ত আসক্তি আমাদের শরীর, মন এবং সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এখনই সময় সচেতন হওয়ার। আমাদের প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো, এই নীরব বিষ আমাদের জীবন, মানবতা এবং জাতির ভবিষ্যৎকে গ্রাস করে ফেলবে।
