ভগবান ব্রহ্মার অন্ডকোষ বিস্ফরণে পৃথিবী ও স্বর্গ সৃষ্টি (মনুসংহিতাঃ ১ঃ১৩, শতপথ ব্রাহ্মণঃ ১১ঃ১ঃ৬, ছান্দোগ্য উপনিষদঃ ৩ঃ১৯ঃ১-৩)

সনাতন হিন্দু ধর্মগ্রন্থ মনুসংহিতার প্রথম অধ্যায়ের সৃষ্টিতত্ত্ব, যা অনেকের কাছে ব্রহ্মার অন্ডকোষ বিস্ফরণে পৃথিবী ও স্বর্গ সৃষ্টি (মনুসংহিতা ১ঃ১৩) হিসেবে পরিচিত।
আজ এখানে আমরা সরাসরি মূল গ্রন্থের ভাষা, শ্লোক, বাংলা অর্থ এবং এর সুনির্দিষ্ট রেফারেন্সসহ এই প্রাচীন আখ্যানটিকে জানব ও বিশ্লেষণ করব।
মনুসংহিতা অধ্যায় ১, শ্লোক নং ১৩
মনুসংহিতার প্রথম অধ্যায়ে সৃষ্টির আদি উপাদান হিসেবে একটি ‘মহাজাগতিক ডিম্ব’ বা গোলকের বর্ণনা রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য এখানে মূল সংস্কৃত ভাষায় (দেবনাগরী লিপি এবং বাংলা লিপ্যন্তরসহ) ১৩ নম্বর শ্লোকটি সরাসরি দেওয়া হলো:
ताभ्यां स शकलाभ्यां च दिवं भूमिं চ निर्ममे ।
मध्ये व्योम दिशश्चाष्टावपां स्थानं च शाश्वतम् ॥
বাংলা উচ্চারণ: তাভ্যাং স শ কলাভাং চ দিবং ভূমিং চ নির্মমে। মধ্যে ব্যোম দিশশ্চাষ্টাবপাং স্থানং চ শাশ্বতম্॥
বাংলা অনুবাদ: “তারপর তিনি (ব্রহ্মা) সেই বিভক্ত ডিম্বের দুটি খণ্ড (শকল) দ্বারা স্বর্গ (উর্ধ্বাকাশ) ও পৃথিবী নির্মাণ করলেন; এবং সেই দুই খণ্ডের মধ্যবর্তী স্থানে মহাশূন্য (ব্যোম), আটটি দিক এবং জলের শাশ্বত স্থান (মহাসমুদ্রসমূহ) সৃষ্টি করলেন।”
অন্যান্য বৈদিক শাস্ত্রে এই অন্ডকোষ সৃষ্ট পৃথিবী তত্ত্বের সমর্থন
মনুসংহিতার এই ‘মহাজাগতিক ডিম্ব’ বা হিরণ্যগর্ভ বিভাজনের তত্ত্বটি কোনো একক ধারণা নয়। এটি সনাতন ধর্মের প্রাচীনতম উৎস ঋগ্বেদ এবং উপনিষদেও সমানভাবে সমর্থিত।
ক) ঋগ্বেদ (হিরণ্যগর্ভ সূক্ত)
ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের ১২১ নম্বর সূক্তটি সম্পূর্ণভাবে এই আদি মহাজাগতিক ডিম্বের শক্তির ওপর উৎসর্গীকৃত। সেখানে বলা হয়েছে:
“হিরণ্যগর্ভঃ সমবর্ততাগ্রে ভূতস্য জাতঃ পতিরেক আসীত…”
অর্থ: সৃষ্টির শুরুতে একমাত্র হিরণ্যগর্ভই (সুবর্ণ ডিম্ব বা শক্তির উৎস) বিদ্যমান ছিলেন। তিনি উৎপন্ন হওয়ামাত্রই সমস্ত সৃষ্ট জগতের একমাত্র পতি বা অধিপতি হয়েছিলেন।
(ঋগ্বেদ সংহিতাঃ ১০ম মণ্ডল, ১২১ সূক্ত – হিরণ্যগর্ভ সূক্ত)
খ) শতপথ ব্রাহ্মণ
বৈদিক যুগের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ শতপথ ব্রাহ্মণে সৃষ্টির এই ডিম্বাকার রূপের আরও স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়:
“আপো হ বা ইদমগ্রে সলিলমেবাস… তদ্ধিরণ্ময়মণ্ডমভবৎ…”
অর্থ: শুরুতে কেবল জল বা আদি উপাদান ছিল… তা থেকে একটি হিরণ্ময় অণ্ড বা সুবর্ণ ডিম্বের উৎপত্তি হলো, যা এক বছর পর্যন্ত এভাবে ভাসমান ছিল এবং তা থেকেই পরবর্তীতে সৃষ্টি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
(শতপথ ব্রাহ্মণঃ ১১ কাণ্ড, ১ প্রপাঠক, ব্রাহ্মণ নং ৬)
গ) ছান্দোগ্য উপনিষদ
উপনিষদেও এই ডিম্ব বিভাজনের হুবহু বর্ণনা পাওয়া যায়:
“আদিত্যো ব্রহ্মেত্যাদেশস্তস্যোপব্যাখ্যানম্… তদাণ্ডমভবত্তত্পরিসংবত্সরস্য মাত্রামশয়ত তন্নিরভিদ্যত তে অণ্ডকপালে রজতং চ সুবর্ণং চাভবতাম্। তদ্যদ্রজতং সেয়ং পৃথিবী যত্সুবর্ণং সা দ্যৌঃ…”
অর্থ: আদিতে জগৎ অসৎ ছিল, তা সৎ হলো। তা একটি ডিম্বে পরিণত হলো। এক বছর পর সেই ডিম্বটি বিদীর্ণ বা বিভক্ত হলো। তার দুটি খণ্ডের মধ্যে যেটি রৌপ্যবর্ণের খণ্ড ছিল, তা হলো এই পৃথিবী এবং যেটি সুবর্ণবর্ণের খণ্ড ছিল, তা হলো স্বর্গ বা আকাশ।
(ছান্দোগ্য উপনিষদঃ ৩য় প্রপাঠক, ১৯ খণ্ড, শ্লোক নং ১-৩)
রেফারেন্স সমূহ
সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার জন্য নিচে মূল গ্রন্থের সুনির্দিষ্ট রেফারেন্স উল্লেখ করা হলো:
নিচে সুনির্দিষ্ট রেফারেন্সের তালিকা দেওয়া হলো:
- মনুসংহিতা (অধ্যায় ১, শ্লোক নং ১৩):
- মনুস্মৃতি (মেধাতিথি, কুল্লূক ভট্টের টীকা সংবলিত)। হরিদাস শাস্ত্রী সম্পাদিত, চৌখাম্বা সংস্কৃত সিরিজ, বারাণসী।
- Manu’s Code of Law: A Critical Edition and Translation of the Mānava-Dharmaśāstra by Patrick Olivelle, Oxford University Press, 2005.
- ঋগ্বেদ সংহিতা (১০ম মণ্ডল, ১২১ সূক্ত – হিরণ্যগর্ভ সূক্ত):
- Rigveda Samhita (With Sayana’s Commentary), Max Müller edition, Oxford.
- ঋগ্বেদ সংহিতা (বাংলা অনুবাদ) – রমেশচন্দ্র দত্ত।
- শতপথ ব্রাহ্মণ (১১ কাণ্ড, ১ প্রপাঠক, ব্রাহ্মণ নং ৬):
- The Satapatha-Brahmana, Translated by Julius Eggeling, Sacred Books of the East (Vol. 44), Oxford University Press.
- ছান্দোগ্য উপনিষদ (৩য় প্রপাঠক, ১৯ খণ্ড, শ্লোক নং ১-৩):
- উপনিষদ গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ) – স্বামী গম্ভীরানন্দ সম্পাদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।
- The Chandogya Upanishad, Swami Swahananda, Sri Ramakrishna Math, Chennai.
