মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম কর্তৃক সীতার প্রতি করা সবচেয়ে বড় অবিচারঃ “শুধুমাত্র একজন ধোপার মন্তব্যের জেরে প্রমাণিত কোন অপরাধ ছাড়াই শ্রী রামচন্দ্র তার গর্ভবতী স্ত্রী সীতাকে দ্বিতীয়বার বনবাসে পাঠিয়েছিলেন” — শ্রীমদ্ভগবত মহাপুরাণ (দ্বিতীয় খণ্ড, নবম স্কন্ধ, ১১তম অধ্যায়)

মর্যাদা পুরুষোত্তমের চরিত্র রাজা রাম কর্তৃক তার গর্ভবতী স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে কোন অপরাধ ছাড়া বনবাসে পাঠিয়ে নিষ্ঠুর অবিচার করা হয়, তা আমরা অনেকেই লোকমুখে শুনেছি।
রামায়ণের অন্যতম বিতর্কিত এবং আবেগঘন অধ্যায় হলো এই দেবী সীতার দ্বিতীয়বার বনবাস। আমরা অনেকেই জানি, একজন সাধারণ ধোবার (ধোপা) মন্তব্যের জেরে বিনা অপরাধে শ্রী রামচন্দ্র গর্ভবতী সীতাকে বনবাসে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আসলেই কি তাই? শাস্ত্র এই বিষয়ে কী বলে?
এই কাহিনীটি অনেকের মনে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে, একজন মর্যাদা পুরুষোত্তম কিভাবে তার গর্ভবতী স্ত্রীকে বনবাসে পাঠাতে পারে। দেবী সীতার কোনো ভুল না থাকা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র লোকনিন্দার ভয়ে নিজের গর্ভবতী স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া কি কোনো সভ্য মানুষের কাজ হতে পারে? রাজা রাম যিনি সমাজের চোখে ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’ এবং ন্যায়ের প্রতীক, তিনি কি সত্যিই একজন সাধারণ ধোবার কথায় নিজের স্ত্রীর প্রতি সুবিচার করেছিলেন? আজ যদি কোনো ভাই বা স্বামী তার গর্ভবতী স্ত্রীকে কোনো কারণ ছাড়া কেবল লোকলজ্জার ভয়ে ত্যাগ করে, তবে কি সমাজ তাকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে মেনে নেবে?
একটি বিষয়টি নিয়ে শাস্ত্রীয় প্রমাণের ভিত্তিতে আলোচনা করা হলো। সাধারণ মানুষের বোঝার সুবিধার্থে পুরো বিষয়টি সহজ আকারে নিচে তুলে ধরা হলো।





ভাগবত পুরাণের সেই পৃষ্ঠা কী বলে?
মূলত ‘শ্রীমদ্ভগবত মহাপুরাণ’ (দ্বিতীয় খণ্ড, নবম স্কন্ধ, ১১তম অধ্যায়) থেকে সরাসরি প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। গীতা প্রেস গোরক্ষপুর থেকে প্রকাশিত এই প্রামাণিক শাস্ত্রে ঘটনার বিবরণটি স্পষ্ট অক্ষরে লেখা রয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, রামচন্দ্র রাজা হওয়ার পর রাতের অন্ধকারে ছদ্মবেশে প্রজাদের মনের অবস্থা এবং তাঁর রাজ্য নিয়ে তাদের চিন্তাভাবনা জানতে বের হতেন। এমনই এক রাতে তিনি প্রজাদের মধ্যে এক অদ্ভুত কথোপকথন শুনতে পান।
ধোবার সেই বিতর্কিত মন্তব্য
ঘটনাটি ছিল এক ধোবা ও তার স্ত্রীর মধ্যকার ঝগড়া নিয়ে। ধোবার স্ত্রী কোনো কারণে তার এক আত্মীয়ের (মাসি বা চাচি) বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন কাটিয়ে ফিরে এসেছিল। এতে রেগে গিয়ে ধোবা তার স্ত্রীকে ঘরে তুলতে অস্বীকৃতি জানায় এবং অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলে:
“তুই দুষ্ট ও কুলটা, তুই পরের ঘরে থেকে এসেছিস! নারী-লোভী রাম হয়তো রাবণের বন্দিদশা থেকে ফিরে আসা সীতাকে আবার ঘরে জায়গা দিতে পারেন, কিন্তু আমি তোকে আর ঘরে রাখব না!”
রামচন্দ্রের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
ধোবার এই কথা এবং প্রজাদের একাংশের মুখে দেবী সীতার চরিত্র নিয়ে এমন কুৎসা শুনে শ্রী রামচন্দ্র গভীরভাবে ভেঙে পড়েন। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, তিনি ‘লোকাপবাদ’ বা লোকলজ্জার ভয়ে ভীত হয়ে পড়েন— অর্থাৎ “লোকে কী বলবে!”
এই লোকনিন্দার হাত থেকে বাঁচতে এবং প্রজাদের সন্তুষ্ট করতে তিনি এক কঠিন ও নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নেন। নিজের গর্ভবতী স্ত্রী সীতাকে কোনো দোষ ছাড়াই ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ফলস্বরূপ, নিরুপায় দেবী সীতা অবশেষে বাল্মীকি মুনির আশ্রমে গিয়ে আশ্রয় নেন এবং সেখানেই তাঁর দুই পুত্র কুশ ও লবের জন্ম হয়।
কেন এটি রাজা রামের মর্যাদা পুরুষোত্তম চরিত্রের বিপরীত কাজ ও স্পষ্ট অবিচার
- দেবী সীতার কোনো ভুল না থাকা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র লোকনিন্দার ভয়ে নিজের গর্ভবতী স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া কি কোনো সভ্য মানুষের কাজ হতে পারে?
- রাজা রাম যিনি সমাজের চোখে ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’ এবং ন্যায়ের প্রতীক, তিনি কি সত্যিই একজন সাধারণ ধোবার কথায় নিজের স্ত্রীর প্রতি সুবিচার করেছিলেন?
- আজ যদি কোনো ভাই বা স্বামী তার গর্ভবতী স্ত্রীকে কোনো কারণ ছাড়া কেবল লোকলজ্জার ভয়ে ত্যাগ করে, তবে কি সমাজ তাকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে মেনে নেবে?
যুগে যুগে রামায়ণের এই অধ্যায়টি নিয়ে বিতর্ক চলেছে। একদিকে যেমন রামচন্দ্রকে তাঁর রাজধর্ম ও প্রজাপালনের কঠোর কর্তব্যের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়, অন্যদিকে দেবী সীতার প্রতি হওয়া এই অবিচার আজও মানুষের মনে প্রশ্ন তোলে। শাস্ত্রের এই অংশটি আমাদের সেই পুরোনো বিতর্ককে আবার নতুন করে ভাবিয়ে তোলে— রাজধর্ম কি সত্যিই নিজের স্ত্রীর প্রতি কর্তব্যের চেয়ে বড় ছিল?









