হিন্দু ধর্মগ্রন্থসমূহে বর্ণিত, বিভিন্ন ভগবান ও দেব-দেবীদের অনৈতিক যৌন অপরাধের কাহিনীর বর্ণনা

হিন্দু ধর্মের ধর্মীয় গ্রন্থ সমূহের সূত্র ধরে, হিন্দু ধর্মগ্রন্থসমূহে বর্ণিত, বিভিন্ন ভগবান ও দেব-দেবীদের অনৈতিক যৌন অপরাধের কাহিনীর আক্ষরিক বিবরণ এবং একজন সাধারণ মানুষের নৈতিকতার জায়গা থেকে সেগুলোর একটি স্পষ্ট ও বিস্তারিত মূল্যায়ন তুলে ধরা হলো-
১. ব্রহ্মা ও শতরূপা (সরস্বতী)
- দেবতার পরিচয়: ব্রহ্মা হলেন হিন্দু ধর্মের সৃষ্টি কর্তা। তাকে সৃষ্টির আদি দেবতা এবং ‘ত্রিমূর্তি’র একজন ধরা হয়। তবে এই অনৈতিক কাহিনীর কারণে হিন্দু সমাজে তাকে পূজনীয় মনে করা হলেও প্রথাগতভাবে তার পূজা করা হয় না।
- ধর্মগ্রন্থের রেফারেন্স: মৎস্য পুরাণ (অধ্যায় ৩-৪) এবং শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ (৩ স্কন্ধ, অধ্যায় ১২)।
- ঘটনা: ব্রহ্মা নিজের শরীর থেকে একটি পরম সুন্দরী নারী মূর্তি সৃষ্টি করেন, যার নাম শতরূপা (কোনো কোনো গ্রন্থে একেই সরস্বতী বা বাণীরূপ বলা হয়েছে)। নিজের সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও ব্রহ্মা তার প্রতি তীব্র কামাসক্ত হয়ে পড়েন। শতরূপা লজ্জিত ও অস্বস্তিবোধ করে ব্রহ্মাকে প্রদক্ষিণ করার বাহানায় তার ডানপাশে, পেছনে ও বামপাশে সরতে থাকেন। ব্রহ্মা নিজের জায়গা থেকে না নড়ে শুধু তাকে দেখার জন্য একে একে ডান, বাম ও পেছনে আরও তিনটি মাথা গজিয়ে ফেলেন। এরপর শতরূপা যখন আকাশের দিকে ওড়ার চেষ্টা করেন, তখন ব্রহ্মার মাথার ওপর আরও একটি (পঞ্চম) মাথা গজিয়ে ওঠে।
- সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে: নিজের হাতের সৃষ্টি কিংবা নিজের সন্তানতুল্য কারো প্রতি একজন সৃষ্টিকর্তার এমন নগ্ন কামবাসনা এবং তাকে দেখার জন্য মরিয়া হয়ে একের পর এক মাথা গজিয়ে ফেলা অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ এবং অস্বস্তিকর। সাধারণ সমাজ বা পরিবারের নৈতিকতার মাপকাঠিতে একজন পিতার এই আচরণ চরম অনৈতিক, নিন্দনীয় এবং বিকৃতির শামিল।
২. দেবরাজ ইন্দ্র ও অহল্যা
- দেবতার পরিচয়: ইন্দ্র হলেন স্বর্গের রাজা এবং দেবতাদের প্রধান শাসক। বৃষ্টি, বজ্র ও যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে। হিন্দু ধর্মে তাকে পরমেশ্বর বা ভগবান বলা হয় না, তিনি স্বর্গের সিংহাসনের মালিক মাত্র, যার চারিত্রিক স্খলনের বহু গল্প রয়েছে। অহল্যা হলেন পরম পূজনীয় মহর্ষি গৌতমের স্ত্রী।
- ধর্মগ্রন্থের রেফারেন্স: রামায়ণ (বাল কাণ্ড, সর্গ ৪৮-৪৯) এবং মহাভারত (শান্তি পর্ব)।
- ঘটনা: ঋষি গৌতমের স্ত্রী অহল্যার সৌন্দর্যে কামাতুর হয়ে পড়েন ইন্দ্র। একদিন ভোরবেলা ঋষি যখন নদীতে স্নান করতে যান, তখন ইন্দ্র ঋষি গৌতমের রূপ ধারণ করে ছদ্মবেশে ছলে-বলে অহল্যার কুটিরে প্রবেশ করেন এবং তার সাথে অনৈতিক শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন। স্নান সেরে ঋষি হঠাৎ ফিরে এসে ইন্দ্রকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। ক্রোধে ঋষি ইন্দ্রকে অভিশাপ দেন, যার ফলে ইন্দ্রের শরীর জুড়ে হাজারটি কুৎসিত চিহ্ন (পরবর্তীতে যা চোখের চিহ্নে রূপান্তর করা হয়) তৈরি হয় এবং তিনি তার পুরুষত্ব হারান।
- সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে: স্বর্গের রাজা বা সমাজের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতার চরিত্র যদি এমন হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের কাছে চরম নিন্দনীয়। নিজের কামলালসা মেটানোর জন্য একজন সম্মানিত ঋষির ছদ্মবেশ ধারণ করে তার স্ত্রীকে প্রতারণা করা এবং পরকীয়ায় লিপ্ত হওয়া সম্পূর্ণ নীতিহীনতা, জঘন্য অপরাধ ও চারিত্রিক দেউলিয়াত্বের প্রমাণ।
৩. চন্দ্র ও তারা
- দেবতার পরিচয়: চন্দ্র হলেন চাঁদের দেবতা এবং নবগ্রহের অন্যতম প্রধান দেবতা। তারা হলেন দেবগুরু বৃহস্পতির স্ত্রী। বৃহস্পতি হলেন দেবতাদের প্রধান শিক্ষক ও পুরোহিত।
- ধর্মগ্রন্থের রেফারেন্স: শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ (৯ম স্কন্ধ, অধ্যায় ১৪) এবং বিষ্ণু পুরাণ (৪র্থ অংশ, অধ্যায় ৬)।
- ঘটনা: চন্দ্র দেবগুরু Brihaspati (বৃহস্পতি)-এর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। শিক্ষা চলাকালীন তিনি তার গুরুর স্ত্রী তারার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। একদিন চন্দ্র সুযোগ বুঝে গুরুর আশ্রমে হানা দিয়ে তারাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে নিজের প্রাসাদে নিয়ে যান এবং তার সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান। গুরু বৃহস্পতি বারবার তার স্ত্রীকে ফেরত চাইলে চন্দ্র অহংকারবশত তা প্রত্যাখ্যান করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বর্গের দেবতা (যারা গুরুর পক্ষে ছিলেন) এবং অসুরদের (যারা চন্দ্রের পক্ষে যোগ দেয়) মধ্যে এক ভয়াবহ মহাজাগতিক যুদ্ধ শুরু হয়, যা ‘তারকাময় যুদ্ধ’ নামে পরিচিত।
- সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে: সুস্থ ও সভ্য সমাজে শিক্ষক বা গুরুকে পিতার স্থান দেওয়া হয় এবং গুরুর স্ত্রীকে মাতৃজ্ঞান করা হয়। সেই গুরুর ঘরে সিঁধ কেটে তার স্ত্রীকে অপহরণ করা এবং তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও নৈতিক অবক্ষয়। একজন দেবতার এই ধৃষ্টতা এবং এর ফলে পুরো সৃষ্টিকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দেওয়া সাধারণ মানুষের চোখে অত্যন্ত জঘন্য এবং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।
৪. যম ও যমী
- দেবতার পরিচয়: যম হলেন মৃত্যু ও ন্যায়ের দেবতা, যাকে ‘ধর্মরাজ’ বলা হয়। মানুষের কর্মের বিচারক তিনি। যমী হলেন তার যমজ বোন।
- ধর্মগ্রন্থের রেফারেন্স: ঋগ্বেদ (১০ম মণ্ডল, ১০ম সূক্ত)।
- ঘটনা: এই সূক্তে ভাই ও বোনের মধ্যকার একটি দীর্ঘ এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল কথোপকথন রয়েছে। বোন যমী নির্জন স্থানে তার ভাই যমকে বংশবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য তীব্র অনুনয়-বিনয় করতে থাকেন। যমী বলেন, গর্ভ থেকেই তারা একসাথে আছেন, তাই তাদের মিলনই নিয়তি। তবে ভাই যম অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বারবার বলেন যে, দেবতারা সব দেখছেন এবং সহোদর বোনের দিকে কামনার চোখে তাকানো বা তার সাথে ঘুমানো চরম ‘পাপ’ ও ‘অধর্ম’। যম শেষ পর্যন্ত নিজেকে পবিত্র রাখেন এবং বোনকে ফিরিয়ে দেন। (অর্থাৎ অডিওর দাবি অনুযায়ী তারা সহবাস করেননি, যম তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন)।
- সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে: যদিও এই কাহিনীতে ভাই যম নৈতিকভাবে সঠিক ছিলেন এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন, কিন্তু একটি পবিত্র ধর্মগ্রন্থে বোন কর্তৃক ভাইকে বিছানায় আসার জন্য এমন প্রকাশ্য, কামার্ত ও বিস্তারিত আকুতি সাধারণ মানুষের মনে তীব্র অস্বস্তি ও ঘৃণার জন্ম দেয়। ভাই-বোনের মতো পবিত্রতম সম্পর্ককে ঘিরে এমন কামনার সংলাপ ধর্মগ্রন্থে থাকাটাই সাধারণ মানুষের নৈতিক বোধে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়।
৫. কৃষ্ণ ও রাধা
- দেবতার পরিচয়: কৃষ্ণকে হিন্দু ধর্মের একটি বিশাল অংশ স্বয়ং পূর্ণ ব্রহ্ম বা ভগবান হিসেবে মান্য করে। রাধা হলেন কৃষ্ণের প্রধানা প্রেমিকা বা সঙ্গিনী।
- ধর্মগ্রন্থের রেফারেন্স: ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ (কৃষ্ণজন্ম খণ্ড)।
- ঘটনা: এই পুরাণের আক্ষরিক বিবরণ অনুযায়ী, রাধা কৃষ্ণের চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন এবং রায়ান (বা অভিমন্যু) নামের এক ব্যক্তির সাথে তার বিয়ে হয়েছিল। এই রায়ান ছিলেন কৃষ্ণের পালক মাতা যশোদার ভাই, অর্থাৎ সম্পর্কে কৃষ্ণের মামা। সেই আক্ষরিক হিসেবে, রাধা ছিলেন কৃষ্ণের মামী। স্বামী থাকা সত্ত্বেও রাধা রাতের অন্ধকারে ঘর ছেড়ে বৃন্দাবনের বনে কৃষ্ণের সাথে গোপন ও অত্যন্ত গভীর প্রণয়লীলায় মত্ত হতেন।
- সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে: কোনো আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা ছাড়া আক্ষরিকভাবে দেখলে এটি একটি স্পষ্ট পরকীয়া এবং পারিবারিক সম্পর্কের সীমানা লঙ্ঘন। একজন বিবাহিত নারী তার স্বামীকে ফাঁকি দিয়ে নিজের চেয়ে বয়সে ছোট এবং সম্পর্কে ভাগ্নে হওয়া এক যুবকের সাথে গোপন শারীরিক ও মানসিক সম্পর্কে জড়াচ্ছেন—এই বিষয়টিকে সাধারণ সমাজ কোনোভাবেই বৈধ বা আদর্শ চরিত্র হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না; বরং এটি পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চরম পরিপন্থী।
৬. গণেশ ও পার্বতী (অডিওর দাবি ও আসল ঘটনা)
দেবতার পরিচয়: পার্বতী হলেন আদিশক্তি, শিবের স্ত্রী। গণেশ হলেন শিব ও পার্বতীর পুত্র, যাকে বুদ্ধির দেবতা ও বিঘ্ননাশকারী হিসেবে পুজো করা হয়।
ধর্মগ্রন্থের রেফারেন্স: শিব পুরাণ (রুদ্রসংহিতা, কুমার খণ্ড)।
ঘটনা: পার্বতী যখন স্নান করছিলেন, তখন নিজের গায়ের হলুদের গুঁড়ো ও মাটি দিয়ে গণেশকে তৈরি করে দরজায় পাহারায় বসিয়ে দেন যাতে কেউ ভেতরে না ঢোকে। গণেশ বিশ্বস্ততার সাথে পাহারা দিচ্ছিলেন। এমন সময় স্বয়ং শিব (গণেশের পিতা) সেখানে এসে ভেতরে ঢুকতে চান। গণেশ মায়ের আদেশ পালন করতে গিয়ে নিজের পিতাকেও ভেতরে ঢুকতে বাধা দেন। এতে শিব চরম ক্রুদ্ধ হয়ে গণেশের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং একপর্যায়ে তরবারি দিয়ে গণেশের মাথা কেটে ফেলেন। পরে পার্বতীর ক্রোধ শান্ত করতে একটি হাতির মাথা এনে গণেশের শরীরে জুড়ে দেওয়া হয়।
সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে: নগ্ন এবং স্নানরত স্ত্রীর স্নানঘরে স্ত্রীর বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করতে গিয়ে দরজায় দাঁড়ানো নিয়ে নিজের সন্তানকে একজন পিতা (যিনি আবার মহাদেব) এতটা ক্রোধে অন্ধ হয়ে আক্ষরিক অর্থেই গলা কেটে হত্যা করতে পারেন—এই পারিবারিক সহিংসতা ও চরম ক্রোধের রূপটি সাধারণ মানুষের মানবিক ও পারিবারিক আদর্শের সাথে খাপ খায় না।
