হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থে, ব্রহ্মা দেবতার নিজের কণ্যার সাথে কামাসক্ত ও যৌন লীলার কাহিনীর বর্ণনা

নিম্নে মৎস্য পুরাণের ৩য় অধ্যায়ের এবং শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের ৩য় স্কন্ধের ১২তম অধ্যায় থেকে, ব্রহ্মা দেবতার নিজের কণ্যার সাথে কামাসক্ত ও যৌন লীলার কাহিনীর বর্ণনা তুলে ধরা হলো-
ব্রহ্মা (সংস্কৃত: ब्रह्मा) হলেন হিন্দুধর্মে সৃষ্টির দেবতা।
হিন্দু পৌরাণিক ধর্মে ব্রহ্মা হলেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা এবং ‘ত্রিমূর্তি’ (ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব)-এর অন্যতম প্রধান দেবতা। হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে তিনি সমগ্র সৃষ্টি, দেবতা, অসুর এবং মানবের আদি উৎস হিসেবে বিবেচিত হন।
- রূপ ও বাহন: তিনি চারমুখী বা চতুর্মুখ এবং চতুর্ভুজ রূপে কল্পিত হন, যার প্রতিটি মুখ চারটি দিক এবং চার বেদকে নির্দেশ করে। তাঁর বাহন একটি রাজহাঁস।
- প্রতীক: তাঁর চার হাতে থাকে বেদ বা পুস্তক, অক্ষমালা (জপমালা), কমণ্ডলু এবং স্রক্ বা ঘৃতপাত্র।
মৎস্য পুরাণের ৩য় অধ্যায়ের বর্ণনা অনুযায়ী, সৃষ্টির শুরুতে ব্রহ্মা যখন মহাবিশ্ব গড়ার কাজ শুরু করেন, তখন তিনি একা ছিলেন। সৃষ্টিকে গতিশীল ও বৈচিত্র্যময় করার জন্য তিনি গভীর ধ্যান শুরু করেন এবং তাঁর শরীর থেকে একটি পরম সুন্দরী নারী মূর্তি প্রকাশ পায়। এই নারীর বিভিন্ন নাম ছিল—শতরূপা (যিনি একশটি রূপ ধারণ করতে পারেন), সরস্বতী, Savitri (সাবিত্রী), গায়ত্রী বা ব্রহ্মাণী।
এরপর সৃষ্টির নিয়ম ও বংশবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ব্রহ্মা শতরূপাকে বিবাহ করেন। তাঁরা দুজনে নির্জনে দীর্ঘকাল অতিবাহিত করেন। তাঁদের এই মিলনের ফলে জন্ম হয় ‘স্বায়ম্ভূব মনু’ এবং ‘শতরূপা’ (অন্যমতে প্রসূতি ও আকূতি) নামক সন্তানদের। এই স্বায়ম্ভূব মনুই হলেন হিন্দু শাস্ত্র মতে পৃথিবীর প্রথম পুরুষ বা মানবজাতির আদি পিতা (ইংরেজি ‘Man’ বা বাংলা ‘মানুষ’ শব্দটি এই ‘মনু’ থেকেই এসেছে)।
শতরূপা যখন ব্রহ্মার সামনে আসেন, ব্রহ্মা তাঁর রূপ ও তেজ দেখে মুগ্ধ হন এবং তাঁর দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলেন না। শতরূপা তখন ব্রহ্মাকে সম্মান জানিয়ে তাঁর চারপাশ দিয়ে প্রদক্ষিণ (ঘুরে আসা) করতে শুরু করেন। কিন্তু ব্রহ্মা এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে তিনি শতরূপাকে চোখের আড়াল করতে চাননি। শতরূপা যখন ব্রহ্মার ডানপাশে গেলেন, তখন ব্রহ্মার ডানদিকে একটি নতুন মুখের সৃষ্টি হলো। একইভাবে তিনি পেছনে ও বামে গেলে ব্রহ্মার আরও দুটি মুখের সৃষ্টি হয়। শেষে শতরূপা যখন লজ্জায় আকাশের দিকে উঠে যেতে চাইলেন, তখন ব্রহ্মার উপরের দিকে একটি পঞ্চম মাথার সৃষ্টি হয় (যা পরবর্তীতে শিব কেটে ফেলেছিলেন)। এভাবেই ব্রহ্মার চারদিকে চার মাথার উৎপত্তি।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের ৩য় স্কন্ধের ১২তম অধ্যায় অনুযায়ী, এই কাহিনীতে সরস্বতীর নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাক্’ (যার অর্থ বাণী, শব্দ বা জ্ঞান)।
ব্রহ্মা যখন নিজের শরীর থেকে উৎপন্ন কন্যা বাক্ (সরস্বতী)-এর প্রতি সাময়িকভাবে মোহাচ্ছন্ন বা কামাসক্ত হন, তখন ব্রহ্মার মানসপুত্ররা (মরিচী, অঙ্গিরা, বশিষ্ঠ, অত্রি প্রমুখ পরম ঋষিগণ) অত্যন্ত লজ্জিত ও বিস্মিত হন। তাঁরা খোদ প্রজাপতি ও পরম গুরু ব্রহ্মার এই আচরণ দেখে তাঁকে জোরালোভাবে বাধা দেন।
ঋষিরা ব্রহ্মাকে বলেন, “হে পিতা! আপনি জগতের গুরু এবং প্রজাপতি। আপনার নিজের কন্যার প্রতি এমন আসক্তি অত্যন্ত অধর্ম। আপনার পূর্বে কোনো সৃষ্টিকর্তা এমন কাজ করেননি এবং ভবিষ্যতেও কেউ করবেন না। আপনার মতো মহান সত্ত্বার পক্ষে এই আচরণ শোভা পায় না।”
পুত্রদের এই নীতিবান ও কঠোর কথা শুনে ব্রহ্মার মোহভঙ্গ হয়। তিনি তীব্র লজ্জা, অনুশোচনা ও আত্মগ্লানিতে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েন। নিজের মন ও চেতনাকে পুনরায় পবিত্র করতে তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর সেই আসক্ত শরীরটি ত্যাগ করেন (দেহত্যাগ করেন)। পুরাণে বলা হয়েছে, ব্রহ্মার ত্যাগ করা সেই কামাসক্ত শরীরটি পরবর্তীতে চারদিকের কুয়াশা, অন্ধকার বা সন্ধ্যায় পরিণত হয়। এরপর তিনি সম্পূর্ণ নতুন ও নিষ্কাম শরীর ধারণ করে পুনরায় মহাবিশ্ব সৃষ্টির কাজে মনোযোগ দেন।
ব্রহ্মার একাধিক মাথা তৈরি হবার কারণ এবং শাস্তিস্বরূপ পাঁচটি মাথার মধ্যে একটি মাথা কেটে ফেলা কারণঃ
ব্রহ্মার পাঁচটি মাথার মধ্যে একটি মাথা কেটে ফেলার মূল কাহিনীটি মৎস্য পুরাণে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে, মৎস্য পুরাণের ৩য় অধ্যায়ে (শ্লোক ৩২ থেকে ৪৩) এই কাহিনীর মূল অংশ বর্ণনা করা হয়েছে। তবে, শিবের দ্বারা ব্রহ্মার এই পঞ্চম মাথাটি সুনির্দিষ্টভাবে কেটে ফেলার বা ছিন্ন করার ঘটনাটি মৎস্য পুরাণের পাশাপাশি শিব পুরাণ (বিদ্যেশ্বর সংহিতা, ৮ম অধ্যায়) এবং ভাগবত পুরাণের সংশ্লিষ্ট তাত্ত্বিক আলোচনাগুলোতে আরও বেশি স্পষ্টভাবে এবং বিস্তারিতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মৎস্য পুরাণ অনুযায়ী, সৃষ্টির শুরুতে ব্রহ্মা মহাবিশ্ব গঠনের উদ্দেশ্যে গভীর ধ্যান করেন এবং তাঁর শরীর থেকে একটি পরম সুন্দরী নারী মূর্তি প্রকাশ পায়। এই নারীর নাম ছিল শতরূপা (যিনি একশটি রূপ ধারণ করতে পারেন), যাকে অনেকে সরস্বতী বা সাবিত্রী নামেও জানেন।
শতরূপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ব্রহ্মা তাঁর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। শতরূপা ব্রহ্মাকে প্রদক্ষিণ (ঘুরে আসা) করতে শুরু করেন। কিন্তু ব্রহ্মা এতটাই কামাসক্ত ও যৌন মুগ্ধ ছিলেন যে তিনি তাঁকে চোখের আড়াল করতে চাননি। শতরূপা যেদিকেই যাচ্ছিলেন, ব্রহ্মার সেইদিকে একটি নতুন মাথা সৃষ্টি হচ্ছিল (ডানদিকে, পেছনে, বামে)। এভাবে চার মাথার সৃষ্টি হয়।
শেষে শতরূপা লজ্জায় বা অস্বস্তিতে আকাশের দিকে উঠে যেতে চাইলে, ব্রহ্মার উপরের দিকে একটি পঞ্চম মাথার সৃষ্টি হয়। পুরাণ অনুযায়ী, এটি ছিল সৃষ্টির শুরুতে ব্রহ্মার প্রথম আসক্তি বা কামভাবের রূপক, যা সৃষ্টির ধারার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও তা এক ধরণের অহংকার ও সীমানা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
শিব, হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে যিনি মহাজাগতিক ভারসাম্য এবং শুদ্ধতার প্রতীক, ব্রহ্মার এই ধরণের যৌন লালসার আসক্তি এবং পঞ্চম মাথার মাধ্যমে প্রদর্শিত অহংকারকে সঠিক মনে করেননি। এটি সৃষ্টিতাত্ত্বিক দিক থেকে এক ধরণের অপবিত্রতা বা অধর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়।
বলা হয়, শিব তখন ব্রহ্মার সেই উপরের দিকে উঠন্ত পঞ্চম মাথাটি কেটে ফেলেন। এর মাধ্যমে শিব সৃষ্টির আদিতে যে আসক্তি বা কামভাব প্রকাশ পেয়েছিল, তা সংশোধন করেন এবং মহাজাগতিক শুদ্ধতা ও ভারসাম্য পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেন।
ব্রহ্মার পূজা না হওয়ার কারণঃ
হিন্দু ধর্মে বিষ্ণু বা শিবের ব্যাপক পূজা হলেও ব্রহ্মার মন্দির ও উপাসনা বিরল। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে তাঁকে দেবী সরস্বতী ও শিবের দ্বারা অভিশপ্ত হতে হয়েছিল, যার ফলে পৃথিবীতে তাঁর পূজা নিষিদ্ধ।









