হিন্দু ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত, দুই মামাতো ভাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের সমকামিতা বা অসামাজিক যৌনাচারের বর্ণনা (পদ্মপুরাণ, পাতালখণ্ড ৪৩/৭৪, শ্লোক ১৭৭-১৯৬)

হিন্দু ধর্মের ধর্মগ্রন্থ পদ্মপুরাণ এর পাতালখণ্ড, অধ্যায় ৭৪ (সংস্করণভেদে ৪৩), শ্লোক নম্বর ১৭৭-১৯৬ তে বর্ণিত, ভগবান কৃষ্ণ ও অর্জুনের অনৈতিক শারীরিক সম্পর্কের বর্ণনা সামাজিক, আইনি এবং সাধারণ মানবিক নৈতিকতার মানদণ্ডে এটি অত্যন্ত বিতর্কিত এবং তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
মূল গ্রন্থের সরাসরি উদ্ধৃতি, মূল ঘটনাটার বর্ণনা ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই কাহিনীর একটি বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
হিন্দু ধর্মে কৃষ্ণ এবং অর্জুনের পরিচয়

সনাতন বা হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় দুটি চরিত্র, যাদের সম্পর্ক একই সাথে পারিবারিক, সখ্যতার এবং আধ্যাত্মিক। মহাভারত ও বিভিন্ন পুরাণ অনুসারে, শ্রীকৃষ্ণ হলেন স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান বা বিষ্ণুর অষ্টম অবতার, যিনি দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য মর্ত্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন। অন্যদিকে, অর্জুন হলেন পঞ্চপাণ্ডবদের মধ্যে তৃতীয় পাণ্ডব এবং দেবরাজ ইন্দ্রের ঔরসে কুন্তীর গর্ভে জন্মগ্রহণকারী এক অপরাজেয় বীর যোদ্ধা।
সনাতন বা হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, পারিবারিক সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন পরস্পরের পিসতুতো-মামাতো ভাই (অর্জুনের মা কুন্তী হলেন কৃষ্ণের পিতা বসুদেবের বোন)। সমসাময়িক সমাজে তাঁরা ছিলেন অভিন্নহৃদয় বন্ধু এবং একে অপরের পরম হিতৈষী।
সনাতন বা হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, কুরুক্ষেত্র নামক ধর্মযুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ কোনো অস্ত্র ধারণ না করে অর্জুনের রথের সারথি (রথচালক) হন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনের মোহভঙ্গ করার জন্য যে কালজয়ী উপদেশ প্রদান করেন, তা-ই বিশ্বখ্যাত ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’ হিসেবে সমাদৃত। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁদের এই যুগলবন্দিকে ‘নর-নারায়ণ’ (অর্জুন হলেন ‘নর’ বা সাধারণ জীবাত্মা এবং কৃষ্ণ হলেন ‘নারায়ণ’ বা পরমাত্মা) হিসেবে গণ্য করা হয়।
পদ্মপুরাণের ভগবান কৃষ্ণ ও অর্জুনের অসামাজিক যৌনতার আখ্যান বর্ণনা



পদ্মপুরাণের এই আখ্যানটিকে পাঠ করলে শ্রীকৃষ্ণের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিশ্বস্ততা এবং নৈতিকতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে। সনাতন ঐতিহ্যে রাধাকৃষ্ণের প্রেমকে যেখানে পরম পবিত্র ও অনন্য হিসেবে দেখানো হয়, সেখানে এই কাহিনীর সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।
পদ্মপুরাণের বিবরণ অনুযায়ী, কুঞ্জের ভেতরে স্বয়ং শ্রীরাধিকা অত্যন্ত অনুরাগ ও লজ্জিত মুখে কৃষ্ণকে সেবা করছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে একটি মধুর মুহূর্ত চলছিল। কিন্তু সেই কুঞ্জেই অন্য একটি চরিত্রের (নারীরূপী অর্জুন) আগমন এবং তাঁর শারীরিক কামনা প্রকাশ পাওয়া মাত্রই কৃষ্ণ তাঁর প্রেমিকা বা স্ত্রী রাধিকার উপস্থিতি ও সম্পর্কের মর্যাদা উপেক্ষা করেন। তিনি রাধিকাকে রেখে তৎক্ষণাৎ সেই সদ্য পরিচিত, বিবাহবহির্ভূত এবং ছদ্মবেশী নারীর হাত ধরে নির্জন বাগানে চলে যান এবং তাঁর সাথে শারীরিক মিলনে লিপ্ত হন।
সাধারণ মানবিক ও সুস্থ নৈতিকতার দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত দৃষ্টিকটু; কারণ যেখানে রাধার প্রতি কৃষ্ণের একক নিষ্ঠা ও ভালোবাসা থাকার কথা, সেখানে এই আক্ষরিক আচরণটি রাধাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রেমের পবিত্রতাকে ক্ষুণ্ণ করে এবং কৃষ্ণকে একজন চপল, সংযমহীন ও পরনারী-আসক্ত চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করে, যা কোনো আদর্শ সম্পর্কের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয়।
পদ্মপুরাণের পাতালখণ্ডের (অধ্যায় ৪৩/৭৪) বর্ণনা অনুযায়ী, সম্পূর্ণ ঘটনাটি ধাপে ধাপে যেভাবে ঘটেছে তা নিচে বিস্তারিত আকারে বর্ণনা করা হলো:
১. রাসলীলা দর্শনের ব্যাকুলতা
একদিন অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের কাছে বৃন্দাবনের পরম গোপনীয় ও অলৌকিক ‘রাসলীলা’ দর্শন করার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেন। শ্রীকৃষ্ণ তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, এই দিব্য লীলাভূমিতে শ্রীকৃষ্ণ ব্যতীত অন্য কোনো পুরুষের প্রবেশের বিন্দুমাত্র অধিকার নেই। সেখানে কেবল গোপী বা নারীরাই প্রবেশ করতে পারেন। কিন্তু অর্জুনের ব্যাকুলতা দেখে কৃষ্ণ তাকে বৃন্দাবনের একটি বিশেষ পবিত্র কুণ্ডে (পুকুরে) স্নান করার পরামর্শ দেন।
২. অলৌকিক রূপান্তর
শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ অনুযায়ী অর্জুন যখন সেই নির্দিষ্ট কুণ্ডের জলে ডুব দেন, তখন অলৌকিকভাবে তাঁর পুরুষ শরীর, পেশীবহুল অবয়ব এবং যোদ্ধার রূপ বিলীন হয়ে যায়। তিনি এক পরম সুন্দরী ও লাবণ্যময়ী নারীতে রূপান্তরিত হয়ে জল থেকে উঠে আসেন।
৩. রাসের কুঞ্জে প্রবেশ ও কামাবেশ
নারীরূপী অর্জুন এরপর রাসস্থলীর মূল কুঞ্জে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি দেখতে পান শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীরাধিকা অত্যন্ত মধুর ও ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে অবস্থান করছেন। রাধিকা দেবী লজ্জিত মুখে শ্রীকৃষ্ণকে তাম্বুল (পান) মুখে তুলে দিচ্ছেন এবং কৃষ্ণ তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছেন। এই দৃশ্য দেখার পর, নারীরূপী অর্জুনের মনে কৃষ্ণের প্রতি তীব্র কামনার উদ্রেক ঘটে এবং তিনি কামাবেশে পুরোপুরি বিবশ হয়ে পড়েন।
৪. নির্জনে মিলন ও বিহার
সর্বজ্ঞ শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের মনের এই কামভাব ও শারীরিক আকাঙ্ক্ষা তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারেন। তিনি নারীরূপী অর্জুনের হাত ধরে রাসস্থলীর ভেতরে থাকা একটি নির্জন ক্রীড়াকাননে (বাগানে) নিয়ে যান। সেখানে অর্জুনের মনের অভিলাষ অনুযায়ী কৃষ্ণ তাঁর সাথে মিলনে বা কামক্রীড়ায় (যথাভিলষিত বিহার) লিপ্ত হন।
৫. পুনরায় পুরুষ রূপে প্রত্যাবর্তন
এই শারীরিক ও মানসিক লীলা বিলাস শেষ হওয়ার পর, শ্রীকৃষ্ণ তাকে পুনরায় সখীদের কাছে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে অর্জুনকে আরেকটি কুণ্ডে স্নান করতে বলা হয়। সেই কুণ্ডে পুনরায় ডুব দেওয়ার পর অর্জুনের সেই সাময়িক নারীরূপ চলে যায় এবং তিনি তাঁর আগের পরিচিত পুরুষ শরীর ও বীর যোদ্ধার রূপে ফিরে আসেন।
গ্রন্থে লিখিত আক্ষরিক কাহিনী বিন্যাস অনুযায়ী, এটিই হলো পদ্মপুরাণে বর্ণিত মূল ঘটনার হুবহু ধারাবাহিক বিবরণ।
মূল গ্রন্থের সরাসরি উদ্ধৃতি

“রাধিকা দেবীও প্রভুর বামপার্শ্বে সলজ্জভাবে থাকিয়া প্রভুকে তাম্বুল দিতেছেন। প্রভু মধ্যে মধ্যে মৃদু হাসিতেছেন, নারীরূপী অর্জ্জুন এই প্রকার প্রভুকে দেখিয়া কামাবেশে বিবশ হইলেন। তখন সেই মহাযোগী প্রভু সর্বজ্ঞ হৃষীকেশ অর্জ্জুনের তাদৃশ মনোভাব জানিতে পারিয়া তাঁহার হাত ধরিয়া ক্রীড়াকাননের মধ্যে আনিয়া তাঁহার সহিত যথাভিলষিত বিহার করিলেন। অনন্তর তাঁহার স্কন্ধদেশে করপল্লব রাখিয়া সখীজনসবিধানে আসিয়া…”
- গ্রন্থের নাম: পদ্মপুরাণ (Padma Purana)
- অংশ: পাতালখণ্ড (Patala Khanda)
- অধ্যায়: ৪৩ (ঐতিহ্যবাহী বাংলা/সংস্কৃত সংস্করণ) / ৭৪ (আন্তর্জাতিক/ইংরেজি সংস্করণ)
- শ্লোক নম্বর: ১৮১ থেকে ১৮৮
“কামাবেশে বিবশ হইলেন”: এটির অর্থ সরাসরি তীব্র শারীরিক ও যৌন কামনার তাড়নাকে নির্দেশ করে।
“যথাভিলষিত বিহার করিলেন”: ‘বিহার করা’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো যৌনক্রীড়া বা কামলীলায় লিপ্ত হওয়া। আর ‘যথাভিলষিত’ মানে হলো মনের ইচ্ছা অনুযায়ী। অর্থাৎ, নারীরূপী অর্জুনের মনে যে কামনার উদ্রেক হয়েছিল, কৃষ্ণ তার হাত ধরে নির্জনে নিয়ে গিয়ে সেই যৌন আকাঙ্ক্ষাই পূরণ করেছিলেন।
এটি কোনো প্রকার সুস্থ সমাজ ব্যবস্থার পরিপন্থী একটি অবৈধ ও অনৈতিক সম্পর্কের চিত্রকেই সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরে।
১৭৭ থেকে ১৯৬ শ্লোকের সম্পূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ:
- শ্লোক ১৭৭ – ১৯০ (প্রেক্ষাপট ও রূপান্তর): অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্নিহিত রূপ এবং তাঁর রাসলীলার রহস্য দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। শ্রীকৃষ্ণ তাকে জানান যে, এই পরম পবিত্র লীলাক্ষেত্রে কোনো পুরুষ শরীরের প্রবেশাধিকার নেই; সেখানে কেবল সখী বা নারীভাব নিয়েই প্রবেশ করা সম্ভব। কৃষ্ণের নির্দেশনায় অর্জুন একটি অলৌকিক পুকুরে ডুব দেন এবং সাথে সাথে এক অপরূপ সুন্দরী নারীতে রূপান্তরিত হন।
- শ্লোক ১৯১ – ১৯৬ (লীলা দর্শন ও মিলন): নারীরূপী অর্জুন যখন সেই দিব্য স্থানে প্রবেশ করেন, তখন তিনি দেখতে পান শ্রীরাধিকা দেবী অত্যন্ত সলজ্জভাবে কৃষ্ণের বাম পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে তাম্বুল (পান) খাওয়াচ্ছেন এবং কৃষ্ণ মৃদু মৃদু হাসছেন। এই মনোরম দৃশ্য দেখে নারীরূপী অর্জুন মোহিত হন এবং কামাবেশে বিবশ হয়ে পড়েন। অন্তর্যামী শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের মনের এই ভাব বা আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পেরে তাঁর হাত ধরেন এবং তাঁকে একটি ক্রীড়াকাননে (বাগানে) নিয়ে গিয়ে তাঁর ইচ্ছা পূরণ করেন (যথাভিলষিত বিহার করেন)।
কাহিনীর বিশ্লেষণ

ভগবান কৃষ্ণ ও অর্জুনের অসামাজিক যৌন সম্পর্ক সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের নৈতিকতাবোধের সাথে তার একটি তীব্র সংঘাত তৈরি হয়। পদ্মপুরাণের পাতালখণ্ডের এই নির্দিষ্ট আখ্যানটি অর্থসহ পড়লে একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে তা কেন অন্যায্য এবং নিন্দনীয় মনে হয়, তার কয়েকটি প্রধান কারণ নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন সম্পর্কে পরস্পরের আত্মীয় (মামাতো-পিসতুতো ভাই) এবং অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অর্জুন কৃত্রিমভাবে নারীরূপ ধারণ করার পর তাদের মধ্যে যে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হয়, তা যেকোনো সুস্থ সমাজব্যবস্থার পারিবারিক পবিত্রতা এবং নৈতিক কাঠামোর পরিপন্থী। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে এটিকে সম্পর্কের এক ধরণের চরম নৈতিক স্খলন হিসেবেই দেখা হয়।
কাহিনী অনুসারে, অর্জুন তাঁর আসল পরিচয় গোপন করে বা রূপ পরিবর্তন করে একটি ভিন্ন সত্তায় প্রবেশ করছেন এবং শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সেই রূপের সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হচ্ছেন। আক্ষরিক অর্থে বিচার করলে, এই ধরণের আচরণকে কোনোভাবেই সমাজ বা ব্যক্তির জন্য আদর্শ বা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বলা যায় না। বরং একে এক ধরণের বিশৃঙ্খলা ও অনৈতিক লালসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য করা যায়, যা সুস্থ চিন্তার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
এই ঘটনায় ভগবান কৃষ্ণ চন্দ্রের চরিত্রের নৈতিকতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন ওঠে। কৃষ্ণের আচরণে এক ধরণের তাৎক্ষণিক যৌন লালসা এবং সংযমহীনতার প্রকাশ ঘটে, যেখানে তিনি একজন সদ্য পরিচিত নারীর সাথে কোনো সামাজিক বা নৈতিক নিয়ম না মেনে এক প্রকার বিবাহবহির্ভূত ও অসামাজিক সম্পর্কে লিপ্ত হন। সাধারণ মানবিক ও নৈতিক মানদণ্ডে, একজন আদর্শ ব্যক্তি বা ঈশ্বরের চরিত্র যেখানে সংযম, পবিত্রতা ও অনুকরণীয় সদাচারের প্রতীক হওয়ার কথা, সেখানে এই ধরণের আচরণকে চরিত্রের এক বড় ধরণের নৈতিক স্খলন বা কামলিপ্সার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। এই আক্ষরিক রূপটি কোনোভাবেই একজন সৎ, ভালো মানুষ কিংবা পরমেশ্বরের আদর্শ চরিত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বরং তা অনিয়ন্ত্রিত লালসা ও আচরণগত বিচ্যুতির এক নিন্দনীয় দৃষ্টান্ত মাত্র।
ধর্মগ্রন্থ বা প্রাচীন সাহিত্যকে সাধারণত নৈতিকতা, সদাচার এবং সমাজকে সঠিক পথ দেখানোর মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া যখন এমন একটি কাহিনী আক্ষরিকভাবে উপস্থাপন করা হয়, তখন তা সাধারণ মানুষের বিবেক ও নৈতিকতাবোধকে গভীরভাবে আঘাত করে। সমালোচকদের মতে, এই ধরণের বিবরণ সমাজকে কোনো ইতিবাচক বার্তা দেয় না, বরং তা সুস্থ ও স্বাভাবিক মনস্তত্ত্বের পরিপন্থী এবং তীব্র নিন্দার যোগ্য।
উপসংহার


পদ্মপুরাণের এই নির্দিষ্ট আখ্যানটিকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রধান বিষয় সামনে আসে।
১. পারিবারিক সম্পর্ক (দুই ভাই)
মহাভারত ও পুরাণ অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন সম্পর্কে পিসতুতো-মামাতো ভাই (অর্জুনের মা কুন্তী হলেন কৃষ্ণের পিতা বসুদেবের বোন)। আক্ষরিক অর্থে, যেকোনো প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় এমন ঘনিষ্ঠ রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের মধ্যে এই ধরণের শারীরিক সম্পর্ককে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর পরিপন্থী বা অসামাজিক হিসেবেই গণ্য করা হয়।
২. সমকামিতা বনাম লিঙ্গান্তর (Gender Transformation)
- শারীরিক রূপান্তর: গ্রন্থে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে অর্জুন কুণ্ডে ডুব দিয়ে সম্পূর্ণ ‘নারীরূপ’ (স্ত্রী শরীর) ধারণ করেছিলেন।
- আক্ষরিক মিলন: কৃষ্ণ একজন পুরুষ হিসেবে এবং অর্জুন সাময়িকভাবে নারী শরীর লাভ করার পর তাঁদের মধ্যে এই মিলন ঘটে।
তাই এটিকে টেকনিক্যালি ‘সমকামিতা’ (দুটি পুরুষ শরীরের মিলন) না বলে, ‘পুরুষ ও রূপান্তরিত নারীর মিলন’ বলা যায়। তবে, তাদের আদি ও মূল পরিচয়ের দিক থেকে দুজন পুরুষ হওয়ায় সমালোচকদের একাংশ এটিকে সমকামী আচরণের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করে থাকেন।
৩. অসামাজিক যৌনাচারের আক্ষরিক ভিত্তি
সাধারণ সামাজিক ও নৈতিক মানদণ্ডের আলোকেও এই ঘটনাটি একটি বিবাহবহির্ভূত, আকস্মিক এবং নিয়মবহির্ভূত সম্পর্ক। আক্ষরিক পাঠে যেহেতু কোনো সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের তোয়াক্কা না করে এই তাৎক্ষণিক মিলনকে দেখানো হয়েছে, তাই একে ‘অসামাজিক যৌনাচার’ হিসেবে চিহ্নিত করার আক্ষরিক ভিত্তি তৈরি হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ভগবান কৃষ্ণ ও অর্জুনের অবৈধ যৌনাচার আধুনিক যুগের যেকোনো বিবেকবান ও সুস্থ সামাজিক মানুষের কাছে একটি অন্যায্য, অনৈতিক এবং অনুচিত আচরণ হিসেবেই গণ্য হবে। এই কারণেই আক্ষরিক পাঠের সমর্থক এবং সমালোচকেরা এই ধরণের লেখনীর তীব্র সমালোচনা ও নিন্দা প্রকাশ করে থাকেন।
